গ্রীষ্মকাল, মঙ্গলবার, ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,২৯শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি, রাত ৩:৩৫
মোট আক্রান্ত

সুস্থ

মৃত্যু

  • জেলা সমূহের তথ্য
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর |

সারাদেশ

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

কুকুরের দুধ পানে বড় মানুষ হওয়া…

admin

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

জন্মের ছয় মাসের মাথায় বাবা ফখরার মাকে তালাক দেয়। অভাবী সংসারের ঘানি টানতে মধুপুর শহরের হাটবাজারে ময়লাআবর্জনা সাফের কাজ নেন জমেলা। হাটের অপরিচ্ছন্ন রাস্তার ধারে অনাদরে বসিয়ে রাখতেন মাসুম ফখরাকে। ক্ষুধায় কাঁদলে হাতের কাজ ফেলে পান করাতেন বুকের দুধ। ক’দিন পর খেয়াল করলেন অনাদরে পড়ে থাকা ফখরার বেজায় ভাব বেওয়ারিশ কুকুরের সাথে। তখন থেকে বুকের দুধ পানের ব্যাকুলতা কমতে থাকে। দুশ্চিন্তায় পড়ে যান মা জমেলা। একদিন অবাককা- দেখে হতবাক হয়ে যায় ফখরার মা। হাটের আবর্জনার স্তুপের আড়ালে দুই ছানার সাথে কুকুরের স্তন চুষছে ফখরা। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নেন তাকে।

এরপর রাস্তার ওপর বসিয়ে রাখা ফখরাকে কাজের সময়েও কড়া নজরে রাখতেন। কিন্তু সুযোগ পেলেই দলবাঁধা নেড়ি কুকুর ছুটে আসতো ফখরার কাছে। আর ফখরা নির্ভয়ে পান করতো কুকুরের স্তন। রাগেক্ষোভে প্রায়ই মারপিট করতেন শিশু ফখরাকে। জামেলা জানান, একদিন ফখরা হারিয়ে যায়। টানা দুদিন পর সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায় পৌরশহরের সান্দারপট্রির জঙ্গলে । এভাবেই কুকুরের সাথে বাড়বাড়ন্তের গল্প ফখরার। পৌরশহরের সব কুকুর এখন ওর খেলার সাথী। বিশ্বস্ত বন্ধু। আসলে কুকুরের দুধ পান করেই বড় হয়ে উঠেছে ফখরা। এভাবেই ফখরার জীবন ঘনিষ্ঠ গল্পের আক্ষরিক বর্ণনা দেন জমেলা বেগম।

পনেরো বছর বয়সে জমেলার বিয়ে হয় জটাবাড়ির আলীম উদ্দীনের সাথে। তিন মেয়ের পর ফখরার জন্ম ২০১১ সালে। অভাবের সংসারে জমেলার মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় ভাইয়ের ভিটায়। বলা অনাবশ্যক, দেড় বছর বয়স থেকে কুকুরের সাথে হাটাচলা, মেলামেশা অবিশ্বাস্য সখ্যতায় রুপ নেয়। চবি্বশ প্রহর পথ চলা, আহারবিহার ও নিশিযাপনে তৈরি হয় অবিচ্ছেদ্য রজু। পাড়ার সব নাওয়ারিশ কুকুরের সাথে ভাব হলেও আদুরী আর বাবুলি সর্বক্ষণের সাথী। ওদের নিয়ে মধুপুর পৌরশহর ছাড়াও গাঙ্গাইর, রক্তিপাড়া, আশ্রা, মোটের বাজার, গারোবাজারসহ উপজেলার হাটবাজার ও গঞ্জ চষে বেড়ায় ফখরা। দুরের রাস্তায় কুকুরের পিঠে পাড়ি দেয়। যেন ঘোড়সওয়ার। বন্ধুর মতো গড়াগড়ি, গলাগলি, কামড়াকামড়ি ও কসরত দর্শকদের মুগ্ধ করে। পাঁচদশ টাকা বখশিস মেলে। তাতে কেনা হয় কলা-পাউরুটি। ভাগাভাগি করে খাওয়া। এভাবেই কলা আর পাউরুটিতে দিন কাটে কুকুরবান্ধব ফখরার। অনেক সময় খাবারের লোভে দল বাধা কুকুর পিঁছু নেয় ফখরার। আর শহরে নবাগত অতিথিদের সাথে ভাব জমাতে সময় লাগেনা তার। মহল্লায় নবাগত আর মনিব অনুগত দু’দল কুকুরের আবহমান ঝগড়ায় দাত খেঁচিয়ে বিবাদ মেটাতে তৎপর থাকে ফখরা। ডজন খানেক বন্ধু নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় শহরবাসি কেউ কেউ কুত্তার বাচ্চা তুলে গালি দেয়। তাতে গায়ে মাখে না ফখরা। দিনাবসানে মধুপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে কুকুরের সাথে কুন্ডলি পাকিয়ে আরামসে সময় কাটায় এ কুকুর বালক। মা জমেলা এখনো মধুপুর বাসষ্টান্ডের পরিচ্ছন্ন কর্মী। তিনি জানান, ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন। লাভ হয়নি। কুকুর না দেখলে উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়। তাই ওকে ওর মতো করে ছেড়ে দিয়েছি।

মধুপুর বাসস্টান্ডের পরিবহন শ্রমিক নির্মল জানান, রাতে এক ডজন কুকুরের কড়া পাহারায় বাড়ি ফেরে ফখরা। মায়ের রান্না করা খাবার ভাগ করে খায়। কাকডাকা ভোরে দলবেঁধে বাসস্টান্ডে। ফখরার তিন বোনের সবার বিয়ে হয়েছে। বড় বোন শাহেদার আক্ষেপ, কুকুরের সাথে থাকা-খাওয়ায় পড়শিরা বিরক্ত। ঘৃণা করে। বকাঝকা করে। কেউ মেশেনা। এমনকি আত্মীয়স্বজনরা বাড়িতে আসেনা। কিন্তু ফখরার ওসবে তোয়াক্কা নেই। জমেলা বলেন, ‘আবাল্য মেশামেশিতে অবুঝ প্রাণীর সাথে এখন নাড়ির বন্ধন। বোবা প্রাণী ওর আপনজন। ওদেও ভাষা বুঝে। আকার ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় করে। কুকুরের সাথে জামাতে খাবার না দিলে অঝোর ধারায় কাঁদে ফখরা। বেশি ক্ষেপলে হাড়িপাতিল ভাঙ্গে। অস্বাভাবিক আচরণ করে। তখন ভয় লাগে। গত ডিসেম্বরে মধুপুর পৌরশহরে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন নিয়ে লঙ্কাকা- বাধায় ফখরা। প্রিয় সহকর্মী কালু ও ভুলু নিধন হয় অভিযানে। এতে ক্ষেপে যায় ফখরা। বাড়িতে অস্বাভাবিক চেঁচামেচি শুরু করে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে মায়ের পরামর্শে একদঙ্গল কুকুর নিয়ে পৌর ভবনে মেয়র মাসুদ পাভেজের সাথে সাক্ষাৎ করে। মেয়রকে জানায়, বন্ধু কালু আর ভুলু কখনো মানুষ কামড়াতো না। তাহলে কেন তারা নিধন হলো। মেয়র আগে থেকেই ফখরাকে চেনেন। তাই আদরসোহাগ সাঁধিয়ে বিদায় করেন এ বালককে। ফখরা জানায়, মেয়র তাকে খুব আদর করেন। তাকে কথা দিয়েছেন। বন্ধুদের আর নিধন করা হবে না। এ জন্য সে খুবই খুশি। এ ব্যাপারে মেয়র মাসুদ পারভেজ ফখরার কুকুর প্রীতি ও কুকুরের দুধ পানে বেড়ে হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক অবাক কা- ঘটে। এটি তার অন্যতম। কুকুর নিধনের প্রতিবাদে ফখরার পৌর অফিসে আসার কথা স্বীকার করে মেয়র বলেন, কুকুরের সাথে মানুষ হওয়া এ শিশুটির চাওয়া ছিল মানবিক। আসলে বিনা কারণে কুকুর নিধন না করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে হাইকোর্টের।

গত ডিসেম্বরে নিধন অভিযানের পর মধুপুর পৌর শহরে বেওয়ারিশ কুকুর কমে যায়। তবে গ্রাম থেকে আসা নবাগত কুকুরের সাথে ফখরার মিতালি গড়ে উঠে সমতালে। পৌর শহরের পাইলট মার্কেটের দোকানি রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, ফখরাকে ছোট্রকাল থেকেই কুকুরের সাথে বড় হতে দেখেছি। কুকুরের দুধ পান করার দৃশ্য অনেকেই অবলোকন করেছেন। মধুপুর পাইলট মার্কেটের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ভুট্রো সরকার বলেন,’আজন্ম কুকুরের সাথে মিতালির দরুন কখনও কখনও ওর মধ্যে অসহিষ্ণু ও ক্ষিপ্ত আচরণ দৃষ্ট হয়। রাগলে গলা দিয়ে অস্বাভাবিক স্বর বের হয়। সর্বক্ষন জিহ্বা বের করে রাখতে পছন্দ। হাটা ও পা ফেলার স্টাইলে কুকুরের অনুকরণ লক্ষনীয়। চোখের নির্বিকার চাহনিতে ক্রুরতা দৃশ্যমান। খুবই ছটফটে ও দুরন্ত স্বভাবের। কোথাও এক দন্ড স্থায়ী হতে চায়না।

মা জমেলা বলেন, ওর কুকুর সঙ্গ বিরত রাখা বিফলে গেছে। জরুরি চিকিৎসা দরকার। আমরা খুবই গরিব। এক বেলা খাবারই জুটেনা। আমার বুকের মানিকের চিকিৎসা করাবো কিভাবে। মানুষে-কুকুরে এ মিতালি বিস্ময়কর না হলেও স্বভাবে হিংস্র ও মানসিক বৈকল্যে আক্রান্ত ফখরার সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহৃদয়বানদের এগিয়ে আসার আর্তি জানান মাতা জমেলা বেগম।

১৮/৪/২০১৭/৩০/মা/হা/

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

সর্বশেষ খবর

Leave a Reply

সর্বাধিক পঠিত

আরো খবর পড়ুন...

বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম :
প্রধান সম্পাদক : লায়ন মোমিন মেহেদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : লায়ন শান্তা ফারজানা
৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা
email: mominmahadi@gmail.com
shanta.farjana@yahoo.co.uk
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।