বসন্তকাল, সোমবার, ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৮ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,২৪শে রজব, ১৪৪২ হিজরি, রাত ১২:২২
মোট আক্রান্ত

সুস্থ

মৃত্যু

  • জেলা সমূহের তথ্য
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর |

সারাদেশ

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

মৌ চাষ করে স্বাবলম্বি নারি মৌ চাষিরা…

admin

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমsarisha

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মৌ চাষি করুণা সরদার। মৌ চাষে এখন তিনি স্বাবলম্বী। পরিশ্রম ও সততাকে পুঁজি করে তিনি এগিয়ে চলেছেন। দশ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলায় মৌ বাঙ্ স্থাপন করে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করেন। করুণার বাড়ি সুন্দরবন সংলগ্ন ইউনিয়ন মুন্সীগঞ্জের চুনকুড়ি গ্রামে।

মৌ চাষ করে করুণা এখন স্বাবলম্বী। মৌ চাষে ভালো আয়ের মাধ্যমে তিনি এখন একটি ছোট চিংড়ি ঘেরের মালিক। দুই কন্যা সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার জন্য খুলনা বয়রা সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি করেছেন। এ ছাড়া মৌ চাষ থেকে তিনি দৈনন্দিন পরিবারের ব্যয় মেটান। একদিকে অধিক মুনাফা অর্জন অন্যদিকে প্রকৃতির মহাঔষধ মধু আহরণে করুণা মৌ চাষে এগিয়ে এসেছেন। ২০০৬ সাল থেকে এ পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার স্বামী সবসময় তাকে সহযোগিতা করেন। তার মৌ চাষের খামারের নাম ‘দাদু ভাই’ মৌমাছি খামার। মৌচাষ করে তিনি এখন এলাকায় খুবই জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তার কারণে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মেম্বার নির্বাচিত হন।

করুণা সরদার জানান, বিসিক ও প্রশিকার সহযোগিতায় চার প্রকারের মৌমাছি ডরসেটা, সেরেনা, ফোরিয়া ও মেলিফোরা নিয়ে মৌ চাষ তিনি করেছেন। বর্তমানে তার ৫৮টি মৌ কলোনি বা মৌ বাঙ্ আছে। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে সে কারণে বিভিন্ন ফুলের মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ হয়। এ সময় সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, যশোর যেতে হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে রাইসরিষা, ধনিয়া, কালজিরা, তিল, ফুলের মধু সংগ্রহে শরিয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ঝিনাইদহ, পাবনা, নড়াইল এবং মার্চ মাসে লিচু ফুলের মধু সংগ্রহে গাজীপুর, নাটোর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুরসহ অন্য স্থানে যেতে হয়। এপ্রিল ও মে মাসে সুন্দরবনের খলিসা, গরান, কেওড়া, বাইনসহ অন্যান্য ফুলের মধু সংগ্রহ করতে হয়। জুন মাসে কালোতিল ফুলের মধু সংগ্রহে ডুমুরিয়া ও অন্যান্য স্থানে যেতে হয়।

ঝিনাইদহ শহরের আদর্শপাড়ার রাজিয়া বেগম। মধু চাষ করে তিনিও স্বাবলম্বী। রাজিয়া বেগম জানান, দুই সন্তান রেখে স্বামী চলে যায়। তারপর প্রতিবেশীর সহায়তায় যুব উন্নয়ন থেকে মৌমাছি পালন, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেই। এরপর মৌমাছি পালন, অর্গানিক সবজি চাষ, মাছ চাষ ইত্যাদি কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি গ্রামের আরও দরিদ্র নারীদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তাদেরকে নিয়ে গড়ে তোলেন জুঁই নামে একটি সমিতি। আস্তে আস্তে পাল্টাতে থাকে তাদের জীবন। অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতির দিকে যেতে থাকে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, অন্যের সাহায্য নিয়ে এক সময় রাজিয়া জীবন চালাতেন আজকে তিনি সমাজে মাথাউঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। নিজের প্রচেষ্টায় তার বর্তমানে ৬ শতাংশ জমি রয়েছে। জমিতে ‘জৈব কৃষি’র আবাদ করছেন। সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। নিজের বসবাসের জন্য বাড়ি করেছেন। তিনি এখন স্বাবলম্বী।

আধুনিক পদ্ধতিতে মৌমাছির চাষ করে মধু আহরণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে। যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ঔষধিগুণসম্পন্ন বহু রোগের প্রতিষেধক মধু চাষকে সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে ২ হাজার মৌখামার ও ১ লাখ ২০ হাজারের অধিক মৌবাঙ্ থেকে মধু আহরণ করা হয়। যা থেকে প্রতি বছর উৎপাদিত হয় ৪ হাজার মেট্রিক টন মধু। মৌচাষের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মৌচাষ করতে পারলে বছরে দশ হাজার টনের বেশি মধু সংগ্রহ করা যায়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-এর তথ্য অনুসারে, এ কার্যক্রম প্রসারে ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মৌচাষ উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে দেশের ১৫ হাজারের বেশি মৌ চাষিকে আধুনিক পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আরও ৬ হাজার নতুন মৌ চাষি তৈরি করা হচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদি ঐ প্রকল্প শেষ হবে ২০১৭ সালে। মৌ চাষে উপযোগী ৫৫টি জেলায় বিশেষ খামার সৃষ্টি করে মধু উৎপাদনে কাজ করছে বিসিক। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক মৌ চাষিকে খামার স্থাপনের জন্য ৯ শতাংশ হারে ব্যাংক সুদে ২৫ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হচ্ছে।

সরকার মৌ চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে চাষিদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে। সরকারি উদ্যোগ ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ফলে মৌমাছি চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম পদ্ধতিগতভাবে মৌমাছি চাষ শুরু হয়। এরপর পরবর্তী একশো বছরে মৌ চাষের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়নি। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে লরেঞ্জ ল্যাংস্ট্রোথ গবেষণার মাধ্যমে কাঠের তৈরি মৌবাঙ্ উদ্ভাবন করেন। বিজ্ঞানসম্মত এ মৌবাঙ্ উদ্ভাবনের জন্য তাকে আধুনিক মৌ চাষের জনক বলা হয়। বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত মৌ চাষের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। কুমিল্লার কোটবাড়িতে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ও আন্তর্জাতিক সমাজ বিজ্ঞানী ড. আকতার হামিদ খানের প্রচেষ্টায় ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মৌ চাষের সূচনা হয়। এর আগে এদেশে অবৈজ্ঞানিকভাবে বন, জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করা হতো। এই মধু সংগ্রহকারীদের মৌয়াল বলা হয়। এখনও অনেক এলাকায় মৌয়ালদের অবৈজ্ঞানিকভাবে মধু সংগ্রহ করতে দেখা যায়।

চিকিৎসকদের মতে, খাঁটি মধু বহু গুণে গুণান্বিত। অনেক রোগের মহৌষধ। এদেশের শস্য শ্যামল মাটিতে রয়েছে মৌ চাষের উপযোগী পর্যাপ্ত বৃক্ষরাজি, রবিশস্য, শাক-সবজি ও ফুলের বাগান। ফুলের পুষ্পরস এবং পরাগ রেণুর অন্বেষায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় মৌমাছি। সংগ্রহ করে মধু। দেশের বিশাল এ উৎস থেকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে মৌ চাষের মাধ্যমে প্রচুর মধু উৎপাদনের পাশাপাশি ফুলের সফল পরাগায়ন ঘটিয়ে কৃষিজাত শস্য এবং ফলের উৎপাদন ও গুণগতমান উন্নয়ন সম্ভব। এদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের উন্নয়নে মৌ চাষ অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। দরিদ্র, ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষিদের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে মৌ চাষ স্বল্প পুঁজিতে অধিক মুনাফা লাভের অবলম্বন হতে পারে।

বর্তমানে বিভিন্ন খাদ্য তৈরিতেও মধু ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া মৌচাকের মোম মোমবাতি তৈরির উপকরণ, প্রসাধন সামগ্রী, ওষুধ শিল্পে, কার্বন পেপার তৈরিতে, পরীক্ষাগারে ডিসেকটিং ট্রে তৈরিতে, বৈদ্যুতিক তার সংযোগ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরিতে, চামড়া ও কাঠ শিল্পে, বস্ত্র শিল্পে এবং আসবাবপত্রের রং ও পলিশের কাজসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এক সময় ফুল চাষিরা সচেতনতার অভাবে তাদের বাগানে মৌচাষ করতে দিতো না, তারা মনে করত ফুলে মাছি বসলে ফুল নষ্ট হয়, ফলন কম হয়। পরে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষায় দেখা গেছে ফুলে মৌমাছি বসলে পরাগায়ণের ফলে অধিক ফলন হয়। এসব বিষয় জানতে পেরে তখন তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে দুই দিকেই লাভ হচ্ছে, একদিকে প্রচুর মধু উৎপন্ন হচ্ছে অপরদিকে অধিক পরাগায়ণের ফলে বেশি ফলন হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মৌ চাষে এগিয়ে আসছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।

 

৩/৪/২০১৭/২২০/তৌ/আ/

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

সর্বশেষ খবর

Leave a Reply

সর্বাধিক পঠিত

আরো খবর পড়ুন...

বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম :
প্রধান সম্পাদক : লায়ন মোমিন মেহেদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : লায়ন শান্তা ফারজানা
৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা
email: mominmahadi@gmail.com
shanta.farjana@yahoo.co.uk
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।