হারিয়ে যাচ্ছে বন মোরগ…

নূরজাহান নীরা, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

বন মোরগ বনে থাকে। বনেই তার জন্ম। বন মোরগ দেখতে হুবহু দেশীয় মোরগের মত হলেও আকার ও ওজনে অনেকটা কম। এটি এক গাছ থেকে অন্য গাছে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উড়ে বেড়ায়। একটি বন মোরগের ওজন সর্বোচ্চ ১ কেজি, আর মুরগির ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রাম হয়।

বন মোরগের মাংস খুবই সুস্বাদু। এর রান্না করা হাড়গুলো কড়কড়ে; মড়মড়ে। বন মোরগের রং লাল আর বন মুরগির রং হালকা লাল, হলুদ ও কালো। বন মুরগি ১০-১২টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো দেখতে দেশীয় মুরগির ডিমের চেয়ে একটু ছোট। বন মোরগ-মুরগি গহীন অরণ্যে থাকতে পছন্দ করে। এক সময় পাহাড়ে গেলেই দেখা যেত বন মোরগের ছুটাছুটি। কিন্তু এখন তা একেবারেই দুর্লভ। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বান্দরবানের লামা উপজেলায় শিকারীদের উৎপাতে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে বন মোরগ।

প্রতি শনি ও মঙ্গলবার লামা পৌর শহরের মাছ বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ১০-২০ জন শিকারী বন মোরগ এবং পোষা বন মোরগের প্রায় বিকিকিনি চলে। প্রকাশ্যে বন মোরগ বিক্রি করলেও এ ক্ষেত্রে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অকার্যকর। ফলে পাহাড় থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে এ মোরগ। আগের মত এখন আর সচরাচর দেখা যায় না বন মোরগ-মুরগি। তবে শুষ্ক মৌসুমে লামা পৌর এলাকার রাজবাড়ী প্রবাসের ডুরি ও জাহাঙ্গীরের ডুরিসহ গহীন পাহাড়ের জঙ্গলে কিছু কিছু সময় বন মোরগ-মুরগি দেখা যায়।

গত মঙ্গলবার সকালে লামা বাজারে কথা হয় বন মোরগ শিকারী নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘরে পোষা বন মোরগকে বন মোরগের আবাসস্থলের কাছাকাছি নিয়ে পায়ে চিকন রশি দ্বারা বেঁধে রাখেন। পোষা বন মোরগ তখন বাঁক দিতে থাকে। তখন বন মোরগগুলো এ মোরগটিকে মারতে আসে। মারামারির এক পর্যায়ে দূরে লুকিয়ে থাকা শিকারী দৌড়ে গিয়ে বন মোরগটিকে ধরে ফেলেন। কোন কোন শিকারী চিকন সুতার কল, ফাঁদ ও জাল দিয়ে একসাথে ৭-৮টি মোরগ-মুরগি শিকার করেন।

আবার কোন কোন শিকারী ধানের সাথে বিষ মিশিয়ে আবাসস্থলে ছিটিয়ে দেয়। আর এ ধান খেয়ে ছোট-বড় অনেক মোরগ-মুরগি মারা যাওয়ার ৩০-৪০ মিনিট আগে জবাই দিতে হয়। অন্যথায় এরা নিজের পায়ের ধারালো নখ দিয়ে গলার রগ ছিড়ে আত্মহত্যা করে।

সূত্র জানায়, শিকারীরা ১টি বন মোরগ বিক্রি করেন ৩০০-৪০০ টাকা। আর বন মুরগি বিক্রি করে ১৫০-২০০ টাকা। অনেকে অতিথি আপ্যায়ন অথবা সখ করে খাওয়ায় জন্য শিকারীদের আগাম টাকা দিয়ে থাকেন। তবে একটি পোষা বন মোরগের দাম ৩-৪ হাজার টাকা। পরীক্ষা নিরীক্ষায় যে বন মোরগটি বেশী ভালো মনে হয় তার দাম আরো একটু বেশি।

তিনি আরও বলেন, অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীত মৌসুম বন মোরগ শিকারের উপযুক্ত সময়। এ সময় একটি পোষা বন মোরগ থেকে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক শিকারী বন মোরগ শিকার কাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।আরেক শিকারী জাফর বলেন, বন মোরগ পোষ মানাতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। প্রথমত বন মোরগের আবাসস্থল থেকে ডিম সংগ্রহ করতে হয়। তারপর দেশি মুরগি দ্বারা তা দিলে ২১ দিন পর বাচ্চা ফুট। বাচ্চা ফোটার দিন থেকে এই বাচ্চা বেঁধে রেখে লালনপালন করতে হয়। না হলে ৫-৭দিন পর অথবা একটু একটু পাখা গজালে বাচ্চাগুলো উড়াল দিয়ে পাহাড়ের জঙ্গলে চলে যায়। এই মুরগি বড় হয়ে ডিম পাড়লে; বাচ্চা ফোটালে ওই বাচ্চা পোষা বা গৃহপালিত হয়। পোষা বন মোরগ শিয়াল বিড়ালে নষ্ট করতে পারে না। এদের রোগ বালাইও কম হয়।অভিজ্ঞদের মতে, ১০টি দেশীয় মুরগি প্রজননের জন্য একটি মোরগ প্রয়োজন হয়। কিন্তু একটি বন মোরগ ২০টিরও বেশি মুরগিকে প্রজনন দিতে সক্ষম। এছাড়া এই বন মোরগ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে খুবই পটু। একটি বন মোরগের সাথে বড় আকারের দুটি দেশিয় মোরগ রড়াই করে কুপোকাত হয়ে যায়। বন মোরগের পায়ের নক ও ঠোঁট খুবই ধারালো।লড়াইয়ের সময় বন মোরগ অন্য মোরগকে নখ দিয়ে আঁচড় দেয় এবং ডানা দিয়ে ঠাস ঠাস আঘাত করে দেশীয় মোরগকে ধরাশায়ী করে ফেলে। স্থানীয়রা জানান, এভাবে বন মোরগ শিকার করা হলে অচিরেই পাহাড় থেকে বন মোরগ হারিয়ে যাবে।

পশ্চিম রাজবাড়ীর বন মোরগ শিকারী মো. শফি আলম বলেন, দিনকাল এখন ভালো যাচ্ছে না। শীত মৌসুম আসলে পোষা বন মোরগটি দ্বারা ১০-১২টি বান মোরগ মুরগি শিকার করি। এক একটি বন মোরগের বাচ্চা ৪০০-৫০০ টাকা হারে বিক্রি করে থাকেন বলে তিনি জানান।এ বিষয়ে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন আহমদ বলেন, বন মোরগ শিকারের বিষয়টি আমি অবগত নই। তবে কেউ বন্য প্রাণী শিকার করলে, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

২/৫/২০১৭/১৫০/