মে 17

স্বর্ণ ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক: অভিযানের নামে হয়রানি…

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর আপন জুয়েলার্সে অভিযান পরিচালনার পর থেকে আতঙ্ক বিরাজ করছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। অভিযানের পর রাজধানীর নামিদামি অনেক শোরুম থেকে স্বর্ণালঙ্কার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, অভিযানের নামে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। অবশ্য এ খাতে শৃঙ্খলা আনতে তারা একটি নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন। রাজধানীর বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে গত ২৮ মার্চ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে শীর্ষস্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত ও তার বন্ধু নাঈমের ধর্ষণের ঘটনার পর অভিযানে নামে এনবিআরের অধীন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। শুল্ক কর্মকর্তারা বলেছেন, আপন জুয়েলার্স থেকে যেসব স্বর্ণালঙ্কার জব্দ করা হয়েছে, সেগুলোর পক্ষে মালিকপক্ষ বৈধ কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের কোনো ব্যবসায়ী এলসি খুলে বাণিজ্যিকভাবে এক তোলা স্বর্ণও আমদানি করেননি। অথচ রাজধানীর বড় স্বর্ণের দোকানগুলোতে শত শত কেজি স্বর্ণ রয়েছে। এসব স্বর্ণের বেশিরভাগই চোরাপথে দেশে আনা হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। শুল্ক গোয়েন্দারা মনে করেন, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে বিভিন্ন সময়ে বহনকারী বা বিমানের কেবিন ত্রুক্র ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যান আড়ালে। বিমানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় দেশে এসব স্বর্ণ নিয়ে আসেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী।

জানা গেছে, স্বর্ণের উৎস জানতে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন ও শিল্প মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে যৌথভাবে একটি তদন্ত পরিচালনা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, দেশে বৈধ উপায়ে কোনো স্বর্ণ আমদানি হয় না। দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশ থেকে একশ্রেণির চোরাকারবারির সহায়তায় স্বর্ণ এনে তা এখানকার বাজারে বিক্রি করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। পরিস্থিতির উন্নয়নে আমদানি নীতিমালা সহজীকরণ, স্বর্ণশিল্পের জন্য নীতিমালা ঘোষণা, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আপন জুয়েলার্সে অভিযানের পর বায়তুল মোকাররম, নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, সীমান্ত স্কয়ারসহ রাজধানীর কয়েকটি স্বর্ণের মার্কেটের বড় বড় শোরুম থেকে অলঙ্কার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। শোরুমের অনেক তাক এখন খালি। একটি বড় শোরুমের আযম নামের এক কর্মী সমকালকে বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি যা যাচ্ছে, তাতে শোরুমে স্বর্ণ রাখা নিরাপদ মনে করছি না।’ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির আইন এবং সেটির ওপর আরোপিত শুল্ককর অত্যধিক, যে কারণে সীমিত আকারে সুযোগ থাকলেও স্বর্ণ আমদানিতে তারা উৎসাহিত নন। তবে গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, বাংলাদেশে স্বর্ণের বাজার অস্বচ্ছ। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার স্বর্ণের দোকান আছে। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ সমিতির সদস্য।

যোগাযোগ করা হলে বাজুসের সাবেক সভাপতি দীলিপ রায় বলেন, ‘আপন জুয়েলার্সে অভিযানের কারণে আমাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বর্ণালঙ্কার ব্যবসায়ীরা কখনই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নন। আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সে জন্য এখানে বেশি বেশি ধরা পড়ছে।’ আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এ খাতের জন্য একটি নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়ে আসছি_ এ কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এটা করা হলে নিবন্ধিত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী স্বর্ণ আমদানি করা যাবে। এর বাইরে বিকল্প হিসেবে সরকার আমদানি করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দিতে পারে। এখন তো এলসি খুলে স্বর্ণ আমদানির নিয়ম আছে, তা হলে আপনারা আনছেন না কেন_ জানতে চাইলে পুরনো এই ব্যবসায়ী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকানুন কঠিন। নানা প্রশ্ন করা হয়। এতে করে আমরা নিরুৎসাহিত হই। বাজুসের আরেক সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের বিচার আমরা চাই। কিন্তু অভিযান চালিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা ঠিক নয়। এতে করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট চার হাজার ৬৩০ কেজি বা প্রায় ১১৬ মণ স্বর্ণ শুল্ক গোয়েন্দারা আটক করেছেন। আটক এ স্বর্ণের মধ্যে সর্বোচ্চ মানের ৫৭ মণ স্বর্ণবার নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে। অস্থায়ী খাত তথা অনিষ্পন্ন অবস্থায় জমা আছে এক হাজার ২৫৬ কেজি বা ৩১ মণের সামান্য বেশি স্বর্ণবার। এর বাইরে স্বর্ণালঙ্কার জমা আছে ৩১৫ কেজি বা প্রায় আট মণ। এ ছাড়া কিছু স্বর্ণ আদালতের নির্দেশে শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে দাবিদারদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, আটক স্বর্ণ বিক্রি করতে নিলাম ডাকার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের একজন করে প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির উপস্থিতিতে এ নিলাম ডাকা হয়। স্বর্ণ চোরাচালান বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে স্বর্ণ বিক্রির নিলাম হচ্ছে না। সর্বশেষ নিলামটি অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ডিজি ড. মইনুল খান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আপন জুয়েলার্সে অভিযান পরিচালিত হয়েছে; অহেতুক কাউকে হয়রানি করার জন্য এটা করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হবে। তবে এতে ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর চায়, এ খাতে শৃঙ্খলা আসুক। ঢালাওভাবে সবাইকে অভিযুক্ত করা হবে না। এখানে অনেক সৎ ব্যবসায়ী আছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চোরাপথে আনার সময় গত তিন বছরে প্রায় এক হাজার ১০০ কেজি স্বর্ণ আটক করা হয়েছে। অথচ তার আগের ১০ বছরেও এত স্বর্ণ ধরা হয়নি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ভুল নীতির কারণে দেশি স্বর্ণালঙ্কার শিল্প ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে এ খাতের জন্য আলাদা নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাগেজ রুলসের আওতায় দেশের বাইরে থেকে আসার সময় একজন যাত্রী ১০০ গ্রাম বা সাড়ে আট ভরি পর্যন্ত স্বর্ণালঙ্কার (গহনা) বিনা শুল্কে আনতে পারেন। এর বেশি আনতে হলে তাকে বাড়তি প্রতি ভরির জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা শুল্ক দিতে হবে। অন্যদিকে, একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২৩৪ গ্রাম বা সমপরিমাণ ২০ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণবার আনতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি গ্রামে (১ ভরি = ১১.৬৬ গ্রাম) তিন হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এখন পর্যন্ত এটি হচ্ছে বৈধ উপায়ে স্বর্ণ আনার নিয়ম। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এলসি খুলে যে কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে যে কোনো পরিমাণ স্বর্ণ বাণিজ্যিকভাবে আনতে পারেন। এনবিআর সূত্র বলেছে, এলসি খুলে এখন পর্যন্ত কেউ স্বর্ণ আনছে বলে তাদের রেকর্ডে নেই। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, নিয়মকানুন খুবই কঠোর। তাই এলসির মাধ্যমে স্বর্ণ আনতে উৎসাহিত নন তারা।

বাজুসের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়াল বলেন, চোরাচালানের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, চোরাচালানে যে পরিমাণ স্বর্ণ ধরা পড়ছে, দেশে এ পরিমাণ স্বর্ণের চাহিদা নেই; বরং চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে, যে কারণে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা বেশি ধরা পড়ছে। তিনি আরও বলেন, স্বর্ণালঙ্কার তৈরিতে ব্যবহৃত ৮০ ভাগ কাঁচামাল সংগৃহীত হয় রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে। অর্থাৎ দেশের ভেতরে মানুষ যেসব পুরনো স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে, সেগুলো ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বেশি জোগান আসে। বাকি ২০ ভাগ আসে বিদেশ থেকে ব্যাগেজের মাধ্যমে। জানা গেছে, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৯টি গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। এসব সংস্থা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে না বলে বারবার স্বর্ণ চোরাচালান ঘটছে।

স্বর্ণালঙ্কার শিল্পে নীতিমালা নেই : দেশ থেকে স্বর্ণালঙ্কার রফতানির লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে প্রথম স্বর্ণালঙ্কার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আজও কার্যকর করা হয়নি। এর পেছনে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতাকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ওই নীতিমালায় বৈধ ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ আমদানির অনুমতি দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে সুপারভাইজড ওয়্যার হাউসে স্বর্ণ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই নীতিমালার অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার পাশাপাশি সরকার এ খাতের দিকে নজর দিলে দেশে স্বর্ণালঙ্কার শিল্পের প্রসার ঘটত। এ খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হতো

১৭/৫/২০১৭/০-৬০-১৭/ম/জা/