এপ্রিল 17

সিটিং লোকাল হলো, কিন্তু কমেনি ভাড়া…

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

ঘোষণা অনুযায়ী সিটিং সার্ভিস লোকাল হলো, কিন্তু কমেনি ভাড়া। তারপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে না হতেই কৃত্রিম সংকট। সব মিলিয়ে চরম নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে গণপরিবহণে। আর দিনভর গণপরিবহণ নিয়ে গণভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে।

জানা গেছে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে ফের ‘সিটিং সার্ভিস’ চালু করতে নীরব আন্দোলন চলছে বাস মালিকদের। অনেক রুটে বাস বন্ধ করে কৃত্রিম গণপরিবহণ সঙ্কট তৈরি করছেন তারা। নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ভোগান্তিতে ফেলছেন যাত্রীদের।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত মেনে লোকাল সার্ভিস চালু করেছে বাস মালিক সমিতি। তবে এ সার্ভিস শুধুমাত্র লোক দেখানো। সরেজমিন গতকাল সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে ১৫ নম্বর পরিবহণে যাত্রী ওঠানোর সময় এক পরিবহণ শ্রমিক উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘কোনো কাবজাব হইব না। ভেতরের কোনো জায়গাই ফাঁকা যেন না থাকে। এক্কেবারে প্যাক কইরা ল। লোকালে যাওনের শখ হয়েছে। শখ মিটায় দে। বেশি কথা কইলে পুলিশের সামনে গিয়া ব্রেক কইরা দিবি।’

বার বার তার নাম জানতে চেষ্টা করলে সে বলে, ‘নাম জানই না কাম নাই। গেলে উঠেন। না গেলে কাবজাব কইরেন না।’

শুধু ১৫ নম্বর পরিবহণই নয়, যাত্রাবাড়ী থেকে থেকে শিকড়, কোমল, শ্রাবণ, লাব্বাইকসহ প্রতিটি পরিবহণে বাদুড়ের মতো ঝুলিয়ে যাত্রী নেয়া হচ্ছে। অথচ মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ভাড়া বাড়ানোর অন্যতম শর্ত ছিল লোকাল বাসে ৮০ শতাংশ আসন পূর্ণ হলেই চলাচল করবে।

সরকারের এ শর্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজধানীতে চলাচল করছে প্রতিটি পরিবহণ। সেইসাথে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার থেকে বেশি। সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী, মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা। আর বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা। চালকসহ যে বাসের সর্বোচ্চ ৩১টি সিট থাকবে তা মিনিবাস হিসেবে গণ্য হবে। আর ৩১টির বেশি সিট থাকলে তা বাস হিসেবে বিবেচিত হবে। সর্বনিম্ন ভাড়ার পাশাপাশি সরকার প্রতি কিলোমিটারের ভাড়াও ১ টাকা ৪২ পয়সা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সে হিসেবে যাত্রাবাড়ী থেকে মতিঝিল ও গুলিস্তানের ভাড়া হওয়ার কথা সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ টাকা। কারণ যাত্রাবাড়ী থেকে মতিঝিল ও গুলিস্তানের দূরত্ব ৩ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু গুলিস্তান ও মতিঝিল রুটে চলাচল করা পরিবহণগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ আদায় করছে ১০ টাকা।

বাড়তি ভাড়া ও বাদুড়ঝোলা করে যাত্রী ওঠানোর বিষয়ে ১৫ নম্বর পরিবহণের ঐ শ্রমিকের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখন সিটিং বন্ধ। লোকাল চালাইতে বলছে। তাই আমরা লোকাল চালাচ্ছি। আর লোকাল পরিবহণ এভাবেই চলাচল করে। প্রতিটি স্টপেজে ৫-৭ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকবে। যার ভালো লাগে সে যাবে। যার ভালো লাগবে না সে যাবে না। লোকাল পরিবহণে ওঠার শখ হয়েছে, এখন দেখুক লোকাল পরিবহণে কত মজা।

এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখা গেছে, এদিন সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে জাবালে নূর, আকিক পরিবহণসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির বাস। মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর-১০, রামপুরা ব্রিজ, মহাখালীসহ বেশ কয়েকটি রুটের বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। একটি বাস আসলেই ২০-২৫ জন ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু উঠতে পারছেন ২/১ জন।

গত ৪ এপ্রিল গণপরিবহণের ‘নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা’ ঠেকাতে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দেন সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ। কথা ছিল, ১৫ এপ্রিল থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস, গেটলক, বিরতিহীন কিংবা স্পেশাল সার্ভিস নামে কোনো গণপরিবহণ চলবে না। একইসঙ্গে সব বাস বিআরটিএ নির্ধারিত চার্ট অনুসরণ করে ভাড়া আদায় করবে।

তবে এ সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে ১৫ এপ্রিলও (শনিবার) রাজধানীতে তথাকথিত সিটিং সার্ভিসের চলাচল অব্যাহত ছিল। এ বিষয়ে গত শনিবার বিকেলে বিআরটিএ’র সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন পরিবহণ নেতারা। বৈঠকে গতকাল রোববার থেকে সিটিং সার্ভিস বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন তারা। তবে পুনরায় ‘সিটিং সার্ভিস’ চালু করতে অভিনব কৌশল নিয়েছে বাস মালিকরা। স্বাধীন পরিবহণের এক বাসচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ রুটে তাদের অনেক বাস আজ (রোববার) বন্ধ রয়েছে। মালিকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ (রোববার) রাস্তায় নামেনি অধিকাংশ বাস।

গতকাল রাজধানীর রামপুরা ব্রিজের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের পাশে প্রায় শ’খানেক লোক বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। একটি বাস আসলেই হুড়োহুড়ি করে ওঠার চেষ্টা করছেন তারা। তবে এসময় রবরব, আলিফ, সু-প্রভাতসহ বেশ কয়েকটি পরিবহণকে রামপুরা ব্রিজ থেকে যাত্রী না নিয়েই চলে যেতে দেখা গেছে।

আর এ সুযোগে কম দূরত্বে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। এদিকে গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর রোডে যাতায়াতকারী অগ্রদূত পরিবহণের একটি বাস আগারগাঁওয়ে থামালেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুনিব রহমান। বাসের মধ্যে ভাড়ার কোনো তালিকা না থাকায় ১ হাজার টাকা জরিমানা করলেন। কেবল এ বাসটি নয়, এই পথে চলাচলকারী বিকল্প ও শিকড়ের কয়েকটি বাসেও ভাড়ার তালিকা পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে আরও কয়েকটি বাসের বিরুদ্ধে। রাজধানীর আগারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার মোড়, শাহবাগ ও রমনা এলাকায় বাসে থাকা এবং অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অভিযোগ, সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলেও বাসগুলো ভাড়া কমায়নি। বরং লোকাল বাসের মতো যেখানে-সেখানে যাত্রী তুলছে। আর সর্বনিম্ন ৭ টাকা ভাড়া থাকলেও বাসের কর্মচারীরা অনেক ক্ষেত্রেই এর চেয়ে বেশি নেয় বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

অবশ্য অতিরিক্ত ভাড়া নেয়াসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে গতকাল রোববার রাজধানীর আসাদগেট, আগারগাঁও (আইডিবি ভবনের সামনে), শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে, রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে ও যাত্রাবাড়ীর চাংপাই রেস্তোরাঁর সামনে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির নেতাদের সাথে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়েছে। অভিযানের কারণে সড়কে বাস কম ছিল। তবে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা ফিরে না আসা পর্যন্ত গণপরিবহণে অভিযান চলবে।

এদিকে ওসমান গনি নামে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরাও বোকা না। এমনিতেই লোকাল সার্ভিস দিয়ে সিটিংয়ের ভাড়া নিচ্ছে, আবার বাস বন্ধ করে ভোগান্তির সৃষ্টি করছে। তাদের (বাস মালিক) চিন্তা করা উচিত, একদিন যদি আমরা গণপরিবহণে ওঠা বন্ধ করি তাহলে তাদের কী অবস্থা হবে?’

যাত্রীদের জিম্মি করে গণপরিবহণ সংকট সৃষ্টির ব্যাপারে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, তারা হয়তো আমাদের নির্দেশনা মেনে অ্যাঙ্গেল ও ক্যারিয়ার ফেলার কাজ করছে। এ কারণে বন্ধ থাকতে পারে। অন্য কোনো উদ্দেশ নেই। কোনো মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে বাস বন্ধ রেখেছে বলে আমার কাছে তথ্য নেই।

 ১৭/৪/২০১৭/৭০/