শব্দদূষণ এক নীরব ঘাতক…..

তৌহিদ আজিজ ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

কান মানবদেহের একটি সংবেদনশীল অঙ্গ। উচ্চ শব্দ বিশেষ করে বাচ্চাদের কানের পর্দাকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত শব্দ যে দূষণ সৃষ্টি করে তারই ফল হচ্ছে কানে কম শোনা। অথচ এই নীরব ঘাতককে প্রতিরোধে আমরা বলতে গেলে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছি না। দিনে দিনে শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সকলেই শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে। একটু সচেতন হলে আমরা এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।

মানুষ বা প্রাণির শ্রুতির একটি নির্দিষ্ট স্বাভাবিক সীমা আছে। সাধারণ মানুষ ২০-২০,০০০ হার্জ মাত্রার কম বা বেশি শব্দ শুনতে পায় না। সহনীয় মাত্রা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ যখন শ্রবণশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তখন তাকে শব্দদূষণ বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) মতে, সাধারণ ৬০ ডিবি শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে ফেলতে পারে এবং ১০০ ডিবি শব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ঢাকা শহরের যে কোনো ব্যস্ত সড়কে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডিবি। এ থেকেই বোঝা যায় আমরা ঢাকাবাসী প্রতিনিয়ত কীভাবে শব্দদূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

বিভিন্ন রাস্তায় সচরাচর সাইনবোর্ড চোখে পড়ে- ‘সামনে স্কুল ভেঁপু বাজাবেন না’, ‘অযথা ভেঁপু বাজাবেন না’ ইত্যাদি। কিন্তু ভেঁপু বাজিয়ে কে কার আগে যাবে- চলছে এ প্রতিযোগিতা। মোটরযান অধ্যাদেশের আওতায় অপ্রয়োজনে হর্ন বাজালে ২০০ টাকা জরিমানা করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী কোনো এলাকায় ৬০ ডেসিবল মাত্রার বেশি শব্দ হলে সেই এলাকা দূষণের আওতায় পড়বে। সংস্থার হিসেব অনুযায়ী অফিস কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণীকক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবল, হাসপাতালে ২০ থেকে ৩৫ ডেসিবল এবং রেস্তোরাঁয় ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবল শব্দমাত্রা সহনীয়।

সরকার ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শব্দদূষণের গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে ঢাকা শহরকে ৫ ভাগে ভাগ করেছে : নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা। এসব এলাকায় দিন ও রাত ভেদে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবাসিক এলাকায় ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবল, শিল্প এলাকায় ৭৫ ডেসিবল, নীরব এলাকায় ৪৫ ডেসিবল, আবাসিক কাম বাণিজ্যিক এলাকায় ৬০ ডেসিবল, রাতের জন্য সর্বত্র ১০ ডেসিবলের কম। এরপর ২০০৬ সালে সরকার বাংলাদেশ শব্দদূষণ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবল। একইভাবে নীরব এলাকার জন্য এ শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর ওপরে শব্দ সৃষ্টি করাকে দ-ণীয় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

শব্দদূষণ এক নীরব ঘাতক। ঢাকা শহরের শতকরা ১০০% মানুষ শব্দদূষণের শিকার। পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপ অনুসারে- ‘সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি শব্দ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত শব্দ- টিনিটাস বা শ্রবণশক্তি হরাস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, অজীর্ণ পেপটিক আলসার, ফুসফুসের রোগ, দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, অনিদ্রা, ভুলোমন, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, অবসাদগ্রস্ততা ইত্যাদির কারণ। যে কোনো স্থানে আধাঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে মাইকে ১০০ ডিবি মাত্রার শব্দদূষণের মধ্যে কাউকে থাকতে হলে তাকে সাময়িক বধিরতার শিকার হতে হবে। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে কাজ করলে যে কেউ বধির হয়ে যেতে পারে। যে কোনো ধরনের শব্দদূষণ সন্তানসম্ভবা মায়ের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ। পরীক্ষায় দেখা গেছে লস এঞ্জেলস, হিথরো এবং ওসাকার মতো বড়ো বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্য জায়গার চাইতে বেশি সংখ্যক পঙ্গু, প্রতিবন্ধী ও অপুষ্ট শিশু জন্ম দেয়।

শব্দদূষণ রোধ করতে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। শব্দদূষণ ক্ষতিকর, আমরা কম বেশি সবাই জানি। কিন্তু এটা প্রতিরোধে কারও সহযোগিতা নেই। তাই শব্দদূষণ রোধের এখনই সময়। কোটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় রেখে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের সকলকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সকলের একটু সচেতনতাই পারে এ সমস্যা থেকে কোটি কোটি মানুষকে মুক্তি দিতে।

 

১০/৪/২০১৭/১০/তৌ/আা/