লারকানা দুর্গ কি টিকাতে পারবে ভুট্টো পরিবার…

 ডেস্ক রিপোর্ট , বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ সিন্ধু। সেখানকার লারকানা এলাকায় বসতি দেশটির সবচাইতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের – ভুট্টো পরিবার। এই পরিবারের প্রধান পুরুষ জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে গড়া দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) একসময় দেশ শাসন করেছে, এখন প্রধান বিরোধী দল। এই দলের টিকেটে ভুট্টো, তাঁর কন্যা বেনজির ও জামাতা জারদারি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। অথচ তাঁদের নিজ এলাকা লারকানার কোনো দর্শনীয় উন্নয়ন হয়নি।

লারকানা আসন থেকে নির্বাচিত হয়েই বেনজির ভুট্টো ১৯৮৮-৯০ এবং ১৯৯৩-৯৬ দু’ মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। শুধু তা-ই নয়, যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, লারকানাবাসী পিপিপিকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। কিন্তু ভুট্টো পরিবারের কাছ থেকে এর বিনিময়ে তেমন কিছুই পায়নি লারকানার মানুষ।

লারকানা নগরীর কেন্দ্রস্থল দিয়ে হেঁটে যান, দেখবেন রাস্তা কাটা, মানুষ গিজ গিজ করছে, স্যুয়ারেজের ময়লা পানিতে রাস্তা সয়লাব আর ট্রাফিক জ্যাম তো আছেই। সব মিলিয়ে অবহেলার চিহ্ন দগদগ করছে।

পিপিপিকে বার বার ভোট দিলেও নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ থেকে বিরত হয় না মানুষ। এরকম একজন সাবির হুসাইন ভুট্টো। লারকানা সিটির এক সঙ্কীর্ণ রাস্তায় একটি খোলা ড্রেনের ওপর একটি ছোট ফলের দোকান চালান সাবির। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই বলেন, ”আমি ভুট্টোর গ্রামেরই (গারহি খুদা বখশ) মানুষ। কিন্তু কী বলবো, ভুট্টোরা আমাদের জন্য কিছুই করেননি।”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ”আমরা গরীবদের জন্য কিছুই নেই। আমাদের কোনো চাকরি নেই, আমার ছেলেমেয়েরা যে একটু ভালো লেখাপড়া শিখবে তার ব্যবস্থা নেই, আমাদের হাতে কোনো টাকা নেই। পলিটিশিয়ানরা বছরের পর বছর শুধু গালভরা ওয়াদাই দিয়ে যাচ্ছেন।”

নিজেদের সমস্যাগুলোর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সাবির। বলেন, ”বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ব্যবস্থাও নেই। শীত তাড়াতে আমাদের লাকড়ি জ্বালাতে হয়। এই ২০১৭ সালে আমরা কাঠ পুড়িয়ে আগুন পোহাচ্ছি, তাও আবার ভুট্টোদের শহরে, কল্পনা করতে পারেন?”

অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং তা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ – এটা গোটা সিন্ধু প্রদেশেই সাধারণ দৃশ্য। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও চিকিৎসাসুবিধার অভাব এখানে একটা কঠিন বাস্তবতা। চিকিৎসাসুবিধার অনুপস্থিতির অভাব তীব্রভাবে অনুভুত হয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন লারকানা থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে শেহওয়ানে এক সুফি খানকায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় কমপক্ষে ৮৮জন নিহত এবং বহু আহত হয়।

সিন্ধু প্রদেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পিপিপি শুধু নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার জন্যই সমালোচিত হয় তা নয়, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও শিক্ষা অবকাঠামো গড়তে ব্যর্থতার জন্যও সমালোচিত হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরত আলিফ আইলান নামের একটি এনজিও’র বার্ষিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আটটি প্রদেশের মধ্যে সিন্ধুর অবস্থান ছয় নাম্বারে। এখানকার মাত্র ২৩% স্কুলে বিদ্যুৎ, পানি, টয়লেট ও সীমানা প্রাচীরের মতো মৌলিক সুবিধা বিদ্যমান।

এ তো একটা এনজিও’র হিসাব। প্রদেশের শিক্ষা খাতের কী অবস্থা, তা নিয়ে প্রাদেশিক সরকারের কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রদেশের দুরবস্থা দূর করতে ২০০৩ সালে সিন্ধু প্রাদেশিক সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিতে শুরু করে। দু’ বছর পর সুবিধাটি দশম শ্রেণী পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেনজির ভুট্টো সিন্ধুতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এছাড়া লারকানার ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে, প্রাচীণ সভ্যতার নিদর্শনস্থল মহেনজাদারোর কাছে আরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। স্থানীয় লোকজন বলছে, এটির নির্মাণকাজ বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে।

লারকানার তৃণমূলের মানুষ বিলাওয়াল বা জারদারির নামই শোনেনি, তারা বেনজিরকে চেনে, এ কথা স্বীকার করলেন আঞ্চলিক দল জেএসকিউএম কর্মী জামীল গাদ। একই সঙ্গে বললেন, বেনজিরের প্রতি জনগণের ভালোবাসা নিয়ে খেলা করেছেন তাঁর স্বামী জারদারি। তিনি সিন্ধুকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, বেনজিরের আসনে আগামী নির্বাচনে লড়বেন তাঁর বড় ছেলে বিলাওয়াল। এখানকার মানুষ বেনজিরকে ভালোবাসে এবং তাঁর কথা মনে করেই পিপিপিকে তারা ভোট দেবে। আমি জানি, বিলাওয়াল হারবেন না। কিন্তু আমার কথাটি শুনে রাখুন, তাঁকে কঠিন লড়াই করতে হবে। লড়াইটি বড় সহজ হবে না।

কঠিন যে হবে, তা বোঝা যায় আরো একজনের কথায়। তিনি লারকানা নগরীর বাসিন্দা জাভেদ। রাস্তাঘাটের দুর্দশার দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি বলেন, এটাই তো সেই শহর, যেটাকে বিলাওয়াল নিজের শহর বলে থাকেন!

তিনি আরো বলেন, বিলাওয়াল থাকেন দুবাই, পড়াশোনা করেন দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, যারা তাকে ভোট দেন, তাদের কাছে আসেন কালেভদ্রে। আপনি কিভাবে নিজেকে নেতা ভাবেন, যখন আমাদের শিশুরা রাস্তার খানাখন্দে পড়ে পড়ে গিয়ে মারা যাচ্ছে!

পিপিপি নেতারা অবশ্য এসব কথা আমলে নিতেই নারাজ। দলের প্রাদেশিক সভাপতি নিসার খসরু বলেন, ”সব বড় নগরেই উন্নয়ন দরকার, লারকানা তো তার বাইরে নয়! সমস্যা যা হচ্ছে তা নগরায়নেরই ফল। সমস্যার কথা আমি অস্বীকার করছি না। সমাধানে কাজ চলছে, একটু সময় লাগবে।”

তিনি বলেন, ”আমি বিশ্বাস করি, লারকানাবাসীর সমর্থন আমাদের প্রতিই আছে। এর বাইরে যদি কেউ আপনাকে অন্য কথা বলে থাকে তাহলে আমি বলবো, আপনি ভুল লোকের সঙ্গে কথা বলেছেন।”

পিপিপি নেতারা যা-ই বলুন, অনেকে কিন্তু বলছেন যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা ভেবেচিন্তে ভোট দেবেন। তাদের এই ভাবনা জেনে অন্য অনেকে আবার ভাবছেন, তাহলে কি পিপিপি’র লারকানা দুর্গে পতনের ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠতে চলেছে?

১৩/৫/২০১৭/১৬০/আ/হৃ/