এপ্রিল 24

লাফ আফটার লাফ: দি হিলিং পাওয়ার অব হিউমার…

ডেস্ক রিপোর্ট , বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

ইতোমধ্যেই আমরা বুঝতে পেরেছি, হৃদরোগ যতটা না হৃৎপিণ্ডের রোগ, তার চেয়ে বেশি এটি হৃদয়ের রোগ। এ রোগের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের মন এবং দৃষ্টিভঙ্গির ভালোমন্দ নানা বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাই হৃদরোগ একটি সাইকোসোমাটিক ডিজিজ বা মনোদৈহিক রোগ। জীবনের একটু গভীরে তাকালে আমরা দেখবো, মনোদৈহিক রোগব্যাধি আর এ ধরনের সমস্যাগুলোর আসল বিষফোঁড়াটা লুকিয়ে আছে জীবন সম্পর্কে আমাদের ভুল ও অবিদ্যাপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গিতেই।

অধিকাংশ মানুষ আজ ঘুরপাক খাচ্ছে না-শুকরিয়া আর ভুল জীবনাচারের বৃত্তে। ঘুরেফিরে সবখানেই একই হাহাকার-নাই নাই, খাই খাই, পাই পাই। এত পাই তবু চাই, আরো চাই। শুধু চাই আর চাই। এই নিদ্রাহীন চাওয়ার যেন কোনো শেষ নেই। জীবনের প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই আমরা বলতে পারছি না-প্রভু তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি অনেক দিয়েছো। আমি কৃতজ্ঞ। অর্থাৎ কৃতজ্ঞচিত্ততা বা শুকরিয়ার অভাব ঘটেছে আমাদের জীবনে। আর এই না-শুকরিয়ার কারণ হলো-নেতিবাচকতা, ক্রমাগত অন্যের সাথে তুলনা, বস্তুর মাঝে সুখ খুঁজে ফেরা ইত্যাদি।

 

না-শুকরিয়ার পরিণতিতে অশান্তি হতাশা অস্থিরতা ভয় বিষণ্নতা মানুষের জীবনকে নানা দিক থেকে আঁকড়ে ধরে। জীবন একসময় হয়ে ওঠে দুঃসহ, ক্লান্তিকর এবং রোগগ্রস্ত। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে হৃদযন্ত্রেও।
তাই একটি সুস্থ সুন্দর ও আনন্দময় জীবনের জন্যে চাই শুকরিয়া ও ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি। শুকরিয়া আমাদের জীবন থেকে নেতিবাচকতার বিষবৃক্ষটিকে সমূলে উৎপাটিত করে, চিরতরে দূর করে অশান্তির সমস্ত জঞ্জাল।

 

চাই শুকরিয়া ॥ সঠিক জীবনদৃষ্টি
আমাদের চারপাশে যত সফল মানুষ আমরা দেখি, তাদের সাফল্যের রহস্য খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, তারা প্রত্যেকেই একেকজন শোকরগোজার বা ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। কেউ তা অনুসরণ করছেন সচেতনভাবে, কিংবা কারো জীবনের সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই এটি। সর্বাবস্থায় শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞচিত্ততার বোধই প্রতিদিন একটু একটু করে তাদেরকে নিয়ে যায় সাফল্য ও নিরাময়ের পথে।

কারণ, একজন শোকরগোজার মানুষের দৃষ্টি সবসময় ‘কী আছে’, সেদিকে। ফলে তার শক্তি, ক্ষমতা আর জীবন-উপকরণ সম্পর্কে তিনি পূর্ণ সজাগ ও সচেতন। জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে তিনি শুরু করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন কর্মোদ্যমী ও সফল। তার সাফল্যের আনন্দ-অনুরণনই তাকে যাবতীয় কষ্ট দুঃখ বিষণ্নতা ও স্ট্রেস থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সুখী জীবনের পথে তিনি পায়ে পায়ে এগিয়ে যান।
সবসময় বলুন, বেশ ভালো আছি
আপনার জীবনের সব ধরনের প্রাপ্তি ও সাফল্য এবং আপনার যা আছে তার সবকিছুর জন্যেই আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ হোন। ধন্যবাদ জানান স্রষ্টাকে। গভীরভাবে তাকান নিজের দিকে। একটু ভাবলেই আপনি আপনার জীবনে পেয়ে যাবেন এমন অসংখ্য উপলক্ষ, যার জন্যে আপনিও বলতে পারবেন, অন্য অনেকের চেয়ে আপনি অনেক ভালো আছেন।

তাই প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই বলুন, শোকর আলহামদুলিল্লাহ/ প্রভু তোমাকে ধন্যবাদ/ থ্যাংক্স গড, একটা নতুন দিনের জন্যে। ভেতর থেকে অনুভব করুন শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞচিত্ততার শাশ্বত অনুভূতি। কুশল বিনিময়ে এবং দিনে যখনই সময় পান, বলুন, শোকর আলহামদুলিল্লাহ, বেশ ভালো আছি। আপনি সত্যিই ভালো থাকবেন।

 

যেখানে আছেন সেখান থেকেই শুরু করুন
শুকরিয়ার প্রকাশ হলো, যা আছে, যতটুকু আছে সেখান থেকেই শুরু করা। পথে নামলে পথই আসলে পথ দেখায়। শোকরগোজার মানুষ যা আছে তা নিয়েই শুরু করে দিতে পারেন, পথে নামতে পারেন, তিনি পথও পেয়ে যান।

তাই নিরাময় বা সাফল্য-যে পথেই এগোতে চান-যা আছে তা নিয়েই নেমে পড়–ন, যেখানে আছেন সেখান থেকেই শুরু করুন। কারণ, যে উদ্যোগ নেয়, সচেতন প্রচেষ্টা চালায়, স্রষ্টার রহমত সবসময় তার সাথেই থাকে।

 

শোকরগোজার হোন ॥ আপনি সুস্থ থাকবেন
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা স্রষ্টার করুণাধারায় সিক্ত। বেঁচে থাকার কত অসংখ্য জীবন-উপকরণ আমরা আপনা-আপনিই পেয়ে যাচ্ছি, উপভোগ করছি। শুধু অক্সিজেনের কথাই যদি ধরি, দিনে কত হাজারবার দম নিচ্ছি, কত লক্ষ-কোটি অক্সিজেন অণু আমাদের বেঁচে থাকায় ভূমিকা রেখে চলেছে। এভাবে যদি হিসেব করি, দিন মাস বছর যুগ মিলিয়ে পুরো জীবনভর এমনি কতভাবে আমরা প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট! কিন্তু আমরা কজনই-বা এজন্যে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই?

আপনি দম নিতে পারছেন, এখনো বেঁচে আছেন-এটাই তো হওয়া উচিত শুকরিয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। আপনি বেঁচে আছেন মানে হলো, আপনার সামনে রয়েছে এক অপার সম্ভাবনার জগৎ। জীবনে কিছু করার সুযোগ রয়েছে আপনার।

আপনি যখন ভেতর থেকে শুকরিয়া জানাতে পারবেন, কৃতজ্ঞচিত্ত হতে পারবেন, তখন আপনার ভেতরের টেনশন অশান্তি অস্থিরতা ভয় দূর হতে শুরু করবে। কমতে থাকবে স্ট্রেস সৃষ্টিকারী ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স। আপনার হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

হাসুন, প্রাণখুলে হাসুন
প্রতিদিন অন্তত কয়েকবার নির্মল আনন্দে প্রাণখুলে হেসে উঠুন। হাসি দিয়েই পৃথিবীর সব সুখ আর আনন্দের শুরু। হাসি সত্যিই আপনার শুকরিয়ার প্রকাশ ঘটায়। হাসির নিরাময়-ক্ষমতা এখন অসংখ্য গবেষণায় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। দেখা গেছে, সবসময় হাসিখুশি থাকেন যারা তাদের রক্তে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ কম থাকে।

‘লাফ আফটার লাফ : দি হিলিং পাওয়ার অব হিউমার’ বইটির লেখক ডা. রেমন্ড মুদি বলেন, আমার পেশাগত জীবনে এমন অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি, যেখানে রোগীরা হাসি দিয়েই সুস্থতা অর্জন করেছেন। হাসি সত্যিই ব্যথানাশক এবং দীর্ঘায়ু ত্বরান্বিত করে। এছাড়াও টেনশনের ফলে শরীরের স্নায়ু ও পেশিতে যে সংকোচন সৃষ্টি হয়, প্রাণবন্ত হাসিতে তা দূর হয়।

হাসি আপনাকে অনেক অযাচিত স্ট্রেস থেকে মুক্তি দেয়। ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডা. উইলিয়াম ফ্রাই-এর মতে, এক মিনিট প্রাণখোলা হাসি কয়েক মিনিট গভীর শিথিলায়নের মতোই উপকারি। তাই একটি নির্মল আনন্দপূর্ণ হাসি দিয়ে শুরু হোক আপনার দিন।

 

প্রার্থনায় লীন হোন
আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন, নিরাময় ও সুস্থতার জন্যে নিয়মিত প্রার্থনা করুন। আপনার কৃতজ্ঞতা আর হৃদয়ের আকুতি জানান স্রষ্টাকে। প্রার্থনা আপনার রোগমুক্তিতে সাহায্য করে। বাড়িয়ে তোলে সুস্বাস্থ্যের সম্ভাবনা।
খোদ পাশ্চাত্যেই একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রার্থনা রোগমুক্তিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। দেখা গেছে, একই ধরনের অসুস্থতায় ভুগছেনÑএমন রোগীদের মধ্যে যারা প্রার্থনা করেছেন কিংবা যাদের জন্যে প্রার্থনা করা হয়েছে তারা তুলনামূলক দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

আমেরিকায় ৫০টিরও বেশি মেডিকেল কলেজে হবু ডাক্তারদের পড়ানো হচ্ছে রোগ নিরাময়ে প্রার্থনার গুরুত্ব। শুধু তা-ই নয়, কীভাবে রোগীদের জন্যে প্রার্থনা করতে হবে, সেটিও শেখানো হচ্ছে তাদের। বিষয়টি এখন আমেরিকায় মেডিকেল কারিকুলামের অন্যতম অনুষঙ্গ। আপনিও তাই সুস্থতা ও রোগমুক্তির জন্যে প্রার্থনায় লীন হোন। নবীজী (স) বলেন, ‘প্রতিটি রোগেরই নিরাময় রয়েছে। আল্লাহ পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ পাঠান নি, যার নিরাময় তিনি দেন নি।’
আত্মনিমগ্নতায় সৃষ্টি হোক

শুকরিয়া ও আনন্দের প্লাবন
দিনের কিছুটা সময় নীরবে কাটান। মেডিটেশন করুন, ধ্যানমগ্ন হোন। ডুব দিন নিজের ভেতর। সুখময় ভাবনার টলটলে স্বচ্ছ জলে ভাসিয়ে দিন নিজেকে। অযাচিত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, বিষাদ আপনাকে ছেড়ে যাবে। আপনি ভারমুক্ত হবেন। সুস্থতা ও নিরাময়ের জন্যেই এটি দরকার।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, নিয়মিত মেডিটেশন করেন যারা, তাদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স দারুণভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। আর মস্তিষ্কের এ অংশটি থেকেই উৎসারিত হয় আমাদের সুখ ও আনন্দের মতো ইতিবাচক আবেগগুলো। মেডিটেশনকালে ব্রেন থেকে নিঃসৃত হয় আনন্দবর্ধক সেরোটনিন ও এন্ডোরফিন নামক রাসায়নিক পদার্থ, যা দেহ-মনে চমৎকার সুখানুভূতি সৃষ্টি করে।

নিয়মিত মেডিটেশন আপনার শুকরিয়ার অনুভূতি বাড়িয়ে দেবে। গভীর আত্মনিমগ্নতায় আপনি লাভ করবেন শুকরিয়ার নতুন উপলব্ধি। হয়ে উঠবেন প্রশান্ত পরিতৃপ্ত এক সুখী মানুষ। এগিয়ে যাবেন সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন ও কর্মব্যস্ত সুখী জীবনের পথে।

২৪/৪/২০১৭/৩০/