বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়…

শান্তা ফারজানা, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

কথায় আছে, বুদ্ধি থাকলে ঘরজামাই হওয়া লাগে না। আবার এই বুদ্ধির জোরে আমাদের অতি পরিচিত ২ বন্ধু আর ভাল্লুকের গল্পে ২য় বন্ধু গাছে উঠতে না পারার পরও মৃত সেজে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। আবার অন্যদিকে কালিদাস নিজে যেই ডালে বসেছিল সেই ডালটিই কাটতে বসেছিল, রবীন্দ্রনাথের পড়ালেখার ছিরিতো আমরা জানি, আইনসটাইন যে একটা সময়ে অংকে কাঁচা ছিল তাওতো আমরা জানি। কাজী নজরুলতো স্কুলের গন্ডিই পেরুননি। তারমানে কি এদের সবার বুদ্ধির অভাব ছিল? অভাব যে ছিলোনা তা তো আমরা সবাই জানি বরং এরা যে কি পরিমাণ বুদ্ধির অধিকারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাহলে বুদ্ধি কি? কিসের ভিত্তিতে আমরা বুদ্ধিমান বলবো একজনকে? একজন লেখককেও বুদ্ধিমান বলা চলে আবার একজন বিজ্ঞানীও বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্যদিকে যে রমনী ঘরের কাজে ও রান্নায় পারদর্শী হয় তাকেও বুদ্ধিমতী বলা হয়। তাহলে বুদ্ধির সংজ্ঞাটি কি ?

বুদ্ধির সংজ্ঞা

বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে বুদ্ধির সংজ্ঞা দিয়েছেন – মনোবিজ্ঞানী ক্যাটেল বলেন – “Intelligence is what intelligence does.” অর্থাৎ বুদ্ধি যে কাজ করে তার মধ্যেই বুদ্ধির পরিচয়। ডিয়ারবার্ণ বলেন – “বুদ্ধি হল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়ার ক্ষমতা।” স্টার্ন বলেন – “বুদ্ধি হল নতুন সমস্যা ও অবস্থার সাথে সংগতি বিধানের সাধারণ মানসিক শক্তি।”যে যত তাড়াতাড়ি শিখতে পারে সে ততবেশি বুদ্ধিমান। প্রকৃতি পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে চলার জন্য, আমাদের জীবনে সমস্ত রকম ক্রিয়াকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এবং সমস্ত সমস্যা সমাধান করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বুদ্ধি আমাদের বড় হাতিয়ার।

বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়

অন্যের কৌশলীবুদ্ধি দেখে অনেকে ভাবেন আহা আমি যদি এমন হতে পারতাম! একটু যদি বুদ্ধি থাকত আমার! এমন আফসোস যাদের তাদের জন্যই এই আয়োজন। হতাশ হবার কিছু নেই। যদিও বুদ্ধি বেশিরভাগই জেনেটিকাল তারপরও আছে বুদ্ধি বাড়ানোর নানা উপায়। বুদ্ধির প্রখরতা বাড়াতে কয়েকটি উপায় অবলম্বন করতে পারেন।

ব্যায়াম

ব্যায়াম করুন। ব্যায়াম শুধু যে ওজন কমায় তা নয়, ব্যায়াম মস্তিস্কের স্নায়ুগুলোকে সক্রিয় রাখে,মস্তিস্কে রক্ত চলাচল নিশ্চিত করে এবং প্রাণবন্ত রাখে। ব্যায়ামের মাধ্যমে ব্রেন সেলগুলো আরও বিকশিত ও শক্তিশালী হয় এবং আন্তঃযোগাযোগ বাড়ে ও মস্তিষ্ককে ড্যামাজ হওয়া থেকে প্রতিহত করে। কারণ ব্যায়ামের সময় প্রোটিন বের হয় মস্তিষ্কের সেল থেকে যা নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর নামে পরিচিত। এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য গঠনে সাহায্য করে এবং ব্রেনকে রক্ষা করে। এছাড়া ব্যায়ামের সময় নার্ভ প্রকেটটিং কম্পাউন্ড বের হয়ে ব্রেনকে রক্ষা করে। hippocampus নামক ব্রেন এর একটি জায়গা আছে যা ব্যায়ামের সময় আকারে বড় হয়ে যায়। এর ফলে Alzheimer’s disease প্রতিহত করতে সাহায্য করে। এই রোগ হলে মানুষ স্মৃতি ভুলে যায়। তাই ব্যায়াম শুধু শরীর কেই নয় বরং মস্তিষ্ক কেও সুস্থ রাখে ও রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।

যেসব খাবার বুদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে সেগুলো হলো –

মাছের তেল

পুরোনো একটা প্রবাদ আছে , মাছ হলো ব্রেন এর খাদ্য। মাছের তেল আমাদের ব্রেন এর জন্য খুবই জরুরী। এটি মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায় ও এটিকে রক্ষা করে। ব্রেন ৫০% ফ্যাট ও লিপিড দিয়ে তৈরি । এর মাঝে ওমেগা ৩ অন্যতম । এটি ব্রেন সেল তৈরি ও মেইনটেইন করে। রক্ষা করে। মাছের তেলে ও তিসির তেলে প্রচুর ওমেগা ৩ পাওয়া যায়।

ভাত রুটি

আমাদের মস্তিষ্ক গ্লুকোজ নির্ভরশীল। বলা যায় যে ,এটিই ব্রেন এর খাবার। আমাদের মস্তিষ্ক ঘন্টায় ৫ গ্রাম গ্লুকোজ খায় কিন্তু জমা রাখতে পারেনা। এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত যায়। শরীরের গ্লুকোজের উপর ব্রেন এর ক্ষমতা নির্ভর করে। এজন্য শস্যদানা টাইপ খাবার খাওয়া উচিত যেমন ভাত, রুটি। এগুলো যদিও কার্বোহাইড্রেট এর উত্‍স । এগুলো পড়ে কনভার্ট হয়ে গ্লুকোজ তৈরি করে। চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত নয়। কেননা বেশি চিনি খেলে তা শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণে তারতম্য ঘটায় যা শরীরে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

কলা

এতে থাকে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২। এটি নার্ভ ইমপালস ট্রান্সমিশনে খুব সাহায্য করে। এছাড়া নিউরোট্রান্সমিটার GABA তৈরিতে সাহায্য করে। যা ব্রেন ঠান্ডা রাখে।

কলিজা

মস্তিষ্কের জন্য ২০% অক্সিজেন দরকার হয়। এই অক্সিজেন হিমোগ্লোবিনের সাথে আটকে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে যায়। আর এই হিমোগ্লোবিনের জন্য দরকার হয় আয়রন। যা কলিজাতে খুব থাকে। তাই গরুর খাসির কলিজা খান। এতে অনেক ভিটামিন বিশেষ করে ভিটামিন বি থাকে প্রচুর।

সামুদ্রিক খাবার

এতে ভিটামিন, প্রোটিন লাইসিন, ম্যাংগানিজ, কপার, লিথিয়াম, জিংক ও আয়োডিন থাকে। যা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ভালো। ছোটবেলায় আয়োডিনের অভাবের কারণে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে থাকে অনেকে।

বেশি বেশি বই পড়ুন

বই ছাড়াও পত্রিকা- ম্যাগাজিন পড়ুন।বই পড়ার মধ্যে বিনোদনের পাশাপাশি শেখার বিষয় আছে। মস্তিস্ক সচল রাখার ক্ষেত্রে বই পড়ার বিকল্প নেই।যত পড়বেন ততই ব্রেন কার্যক্ষম হবে।

পাজল দেখুন

পাজল, ক্রসওয়ার্ড, দাবা, সুডুকু, বিভিন্ন ভিডিও গেম ইত্যাদি খেলুন। এ ধরনের খেলা মস্তিস্কের শক্তি বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

ভালো ঘুম

রাতে নিয়ম করে আগেভাগেই ঘুমাতে যাবেন এবং সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠবেন। কমপক্ষে ৮ ঘন্টা ঘুমানো চাই। মস্তিস্কের সক্রিয়তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভালো ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।

টেলিভিশন কম দেখুন

টেলিভিশনের সামনে আমরা অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করি। টিভি দেখুন,কিন্তু টিভিতে আসক্ত হয়ে পড়লে চলবে না। টিভি দেখার চেয়ে বই পড়া অনেক ভালো। অবসর পেলে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলুন, গান শুনুন অথবা রান্না করুন।

মেডিটেশন করুন

মেডিটেশন করলে চিন্তা ও চাপ কমে। মনোযোগ বাড়ে। ব্রেন এর কার্যক্ষমতা বাড়ে। প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করুন। চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে মনকে একীভুত করার চেষ্টা করুন। এজন্য মেডিটেশন ক্যাসেট বা বই পড়ে উপায়গুলো রপ্ত করুন। বুদ্ধিমান মানুষের সংস্পর্শে থাকুন।

১১/৪/২০১৭/৯০/শা/ফা/