বিয়ের ব্যবসা বসিয়ে টাকা কামাচ্ছে এক ভন্ড প্রেমিক…

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

প্রেমের প্রলোভনে বিয়ে করে টাকা কামানোই তার ব্যবসা। ছদ্মনামে বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেয় সে। কৌশলে নানা প্রতারণার মাধ্যমে সহকর্মী তরুণীর সঙ্গে গড়ে তোলে প্রেমের সম্পর্ক। একপর্যায়ে পাতানো বিয়ের পর অর্থ সম্পদ লুটে নিয়ে কেটে পড়ে। একাধিক খুনের সঙ্গে জড়িত সে।

লক্ষ্মীপুরে আয়েশা আক্তার লিপি (২১) নামে কুমিল্লার এক তরুণীকে হত্যার সাত মাস পর পরিবার লাশ শনাক্তের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ভয়ঙ্কর এ প্রতারকের নাম হারুন ওরফে আবু সাঈদ (৪০)। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার উত্তর চর কালকিনী গ্রামে।

গত ৩ জুন ফেসবুকে ছবি দেখে ওই লাশ শনাক্ত করেন নিহতের স্বজনরা। এর আগে গত বছরের ৯ নভেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সুতার গোপটা এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আয়েশা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোহনপুর গ্রামের আসলাম মিয়ার মেয়ে। এইচএসসি পর্যন্ত পড়ুয়া আয়েশা কুমিল্লা ইপিজেডের ইয়াং থাই সুয়েটার ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতেন। প্রেমের সর্ম্পকের পর বিয়ে করে পরিকল্পিতভাবে তাকে স্বামী হারুন সহযোগীদের নিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ তার বাবা-মার।

এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনটি আরো বলছে, আয়েশা ছাড়াও আরো একাধিক নারীকে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে ও হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে হারুনের বিরুদ্ধে।

উত্তর চরকালকিনী গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, হারুন ছোট বেলা থেকে চুরি-ডাকাতি, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি একাধিক নাম ব্যবহার করে লক্ষ্মীপুরের ছুটকীর সাঁকো এলাকা, কুমিল্লার লাকসাম ও চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৭-৮টি বিয়ে করে। কয়েক বছর আগে কুমিল্লার লাকসামে বিয়ে করা স্ত্রীকে হত্যারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি মেয়েদের কৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে সবকিছু নিয়ে সটকে পড়েন।

আয়েশার স্বজন ও পুলিশ জানায়, আয়েশা কুমিল্লা ইপিজেডের ইয়াং থাই সুয়েটার ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানে নিজের ও বাবার নাম গোপন রেখে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি নেন কমলনগরের উত্তর চরকালকিনী গ্রামের ছৈয়াল বাড়ির নূর মোহাম্মদের ছেলে হারুন। একপর্যায়ে আয়েশার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তিন লাখ টাকা দেন মোহরে কোতোয়ালি থানার কাজী জহিরুল ইসলামের মাধ্যমে বিয়ে করেন। কাবিনে হারুন ও তার সহযোগীরা প্রকৃত ঠিকানা গোপন রাখেন। হারুন গত বছরের ৮ নভেম্বর কলকাতায় কথিত ভাইয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে স্ত্রী আয়েশাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। পরে তাদেরকে মোবাইল ফোনে না পেয়ে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন আয়েশার বাবা আসলাম।

গত বছরের ৯ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের সুতার গোপটা এলাকার ধানক্ষেত থেকে আয়েশার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পরিচয় না পেয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে তার লাশ লক্ষ্মীপুরে দাফন করে পুলিশ। ওই ঘটনায় লক্ষ্মীপুর মডেল থানার এসআই জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরভূতা গ্রামের সিরাজ আনসারের ছেলে সোহেল (৩৩) ও লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মধ্য বাঞ্চানগরের আবুল কাশেমের ছেলে সোহেলকে (২৩) গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিতে জানান, গত ৮ নভেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুরের ভবানীঞ্জ বাজারের দক্ষিণে মেইন রোডের ওপর আয়েশাকে দেখে তাকে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে একটি খামারে নিয়ে যান। পরে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ঘটনাস্থলে ফেলে যান।

এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ওই দুই আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেন। বর্তমানে জেলা জজ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন।

গত বুধবার লক্ষ্মীপুর জজ আদালত প্রাঙ্গণে আয়েশার মা নিলুফা আক্তার ও বাবা আসলাম মিয়া জানান, তার মেয়েকে কলকাতায় বেড়ানোর পর জাপানে নেওয়ার কথা বলেই প্রতারক হারুন বাড়ি থেকে বের করে নেন। এ সময় পাসপোর্ট, মেয়ের জমানো দেড় লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের জন্যই হারুন তার সহযোগীদের নিয়ে মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। তারা এ হত্যার বিচার চেয়ে হারুনসহ তিনজনকে এ হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

চরকালকিনী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আবদুল খালেক জানান, হারুন ভয়ংকর অপরাধী। তিনি চুক্তিতে মানুষও খুন করেন। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে অনেক নারী খুনের রহস্য বেরিয়ে আসবে।

 

এদিকে, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার কারণে হারুনকে কোর্ট এফিডেফিটের মাধ্যমে ২০০৬ সালে ত্যাজ্যপুত্র করা হয়েছে দাবি করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। তার মা মনোয়ারা বেগম ও ভাই শাহাদাৎ হোসেন জানান, হারুন বিভিন্ন মামলায় একাধিকবার জেল খেটেছে। তার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই। এ সময় তারা ছবি দেখে হারুনকে শনাক্ত করেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আ স ম মাহাতাব উদ্দিন জানান, আদালতে মামলাটির পুনরায় তদন্তের আবেদন করা হলে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া যাবে। আদালতের নির্দেশনামতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯-০৬-১৭-০০-৩০–আ-হৃ