বিস্তীর্ণ মাঠ তৈরি ভূতের সেতু…

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

বিস্তীর্ণ মাঠ, আশপাশে নেই লোকালয়, কৃষক ও কৃষিশ্রমিক মাঠে যাওয়া আসা করেন জমির আইল দিয়ে। নেই কোনো সড়ক তবু সেখানেই নির্মাণ করা হচ্ছে সংযোগ সেতু। রাজশাহীর তানোরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে খাড়ির ওপর ছয়টি সেতু নির্মাণ কাজের প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সপ্তাহ দুয়েক আগে শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। সংযোগ সড়ক ছাড়া শুধু সেতু নির্মাণ করায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের বক্তব্য, সড়ক ছাড়া সেতু নির্মাণ অর্থহীন। কারণ নির্মাণাধীন এ সেতু স্থানীয় মানুষের কোনো কাজে আসবে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়ক ছাড়া কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এসব সেতু নির্মিত হলে ভবিষ্যতে তা ভূতের সেতু হিসেবেই পরিগণিত হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চারটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় খাড়ির ওপর ছয়টি সেতু নির্মাণে তালিকা প্রস্তুত করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে পাঠানো হয় গত বছরের আগস্টে। তালিকা মোতাবেক নকশা অনুমোদন করে গত বছরের ৫ অক্টোবর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর দরপত্র আহ্বান করে। ছয়টি সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৩১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৯ টাকা। এর মধ্যে উপজেলার বাঁধাইড় ইউপির গাল্লা প্রকাশনগর এলাকায় খাড়ির ওপর ৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ কাজে ৫৬ লাখ ৮৯ হাজার ১০৬ টাকা ব্যয় ধরা হয়। একই পরিমাণ ব্যয়ে কলমা ইউনিয়নের বলদিপাড়া মোয়াতলা খাড়ির ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া কলমা ইউনিয়নের বংশীধরপুর খড়খড়ি ঘাটে খাড়ির ওপর ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ কাজে ২৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৫ টাকা ও রামনাথপুর গুটিংপাড়া হতে চকনাকা পর্যন্ত খাড়ির ওপর ৩৪ ফুট সেতু নির্মাণ কাজে ২৭ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৬ টাকা ব্যয় ধরা হয়। অপরদিকে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের বনকেশর মরাপাড়ায় খাড়ির ওপর ৪০ ফুট সেতু নির্মাণ কাজে ৩২ লাখ ৫২ হাজার ৬৫৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়। ঐ একই পরিমাণ ব্যয়ে উপজেলার সরনজাই ইউনিয়নের বিলি্ল খাড়ির ওপর মুকুলের জমির নিকট সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে কালভার্ট আকারের এসব সেতুর নির্মাণ ব্যয় দ্বিগুণ ধরা হয়েছে বলে উপজেলা এলজিইডি বিভাগ দাবি করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডি’র একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকল্পের অর্থ লোপাটের জন্যই সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ে সেতুর নামে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁধাইড় ইউনিয়নের গাল্লা প্রকাশনগর খাড়ির ওপর ৬০ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ কাজ চলছে। সেতুটি নির্মাণ শুরু হলেও সংযোগ সড়ক নেই। সেতুর মাথায় রয়েছে ধান খেত। স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলছেন, এই সেতুটির পাশে দুইশ হাত দক্ষিণে ঐ একই খাড়ির ওপর সেতু ও সড়ক রয়েছে। যে পরিমাণ টাকা দিয়ে অহেতুক সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে তা দিয়ে এলাকার ভাঙা রাস্তা মেরামত করা যেত। এর ফলে মানুষ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেত। এছাড়া সংযোগ সড়ক ছাড়াই সেতু নির্মাণ অর্থহীন। তার দাবি, একটি বিশেষ গোষ্ঠী লুটপাটের জন্যই এ ধরনের প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। একই অবস্থা কলমা ইউনিয়নের বলদিপাড়া মোয়াতলা খাড়ির ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। এই সেতুর দুই পাশে বনবিভাগের বিপুলসংখ্যক ওষুধি ও বনগাছ রয়েছে। এছাড়া পাঁচন্দর ইউনিয়নের বনকেশর মরাপাড়া হতে বানিয়াল পর্যন্ত খাড়ির ওপর ৪০ ফুট সেতুর পাশে মরাখাল ও ধান খেত। এই সেতুর স্থানে নকশায় কোনো সড়ক নেই। একই ধরনের অবস্থা সরনজাই ইউনিয়নের বিলি্ল খাড়ির ওপর মুকুলের জমির নিকট সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। উপজেলার বনকেশর গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সড়ক ছাড়া সেতু মূল্যহীন। কারণ সড়ক না থাকলে মানুষ সেতু ব্যবহার করতে পারবেন না। জমির আইল দিয়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিক হাঁটেন। তাই সেতু নির্মাণ করা হলেও, তা মানুষের কাজে আসবে না। একই ধরনের মন্তব্য করেন উপজেলার সরনজাই গ্রামের জালাল হোসেন। তিনি বলেন, সেতু নির্মাণের অজুহাতে সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা এবং ঠিকাদাররা সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করছেন। এ প্রকল্প সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসবে না। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শওকাত আলী বলেন, এসব কাজের নকশা সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। তিনি কেবলমাত্র দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। কোনো ঠিকাদার কাজে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।

 

১০/৪/২০১৭/১৪০০/নূ/নী/