বিষন্ন বেদনায় : কোজাক-এর নতুন বছর হোক সম্ভাবনার-উত্তরণের

বেলাল হোসেন ঢালী

‘কাউকে সারা জীবন কাছে পেতে চাও? তাহলে প্রেম দিয়ে নয়, বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখো। কারণ, প্রেম একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু বন্ধুত্ব কোনো দিন হারায় না।’ উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের এই উক্তি আবারো মনে করিয়ে দিল আমার বন্ধু রুবেলের পাঠানো একটি ছবি। ছবির মানুষটির নাম বাকীউল্লা।  আমারা ওকে ডাকতাম ‘কোজাক’ বলে। আমার কলেজজীবনের প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে সে একজন। ছবিটি দেখে আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।

আমার একদল বন্ধুদের মাঝে আমি, রুবেল, পলাশ ও বাকীউল্লা ছিলাম সবচেয়ে কাছের। আমাদের বাড়ি থেকে বাকীদের বাড়ি ছিল প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে। তার পরও প্রতিদিন দিনে-রাতে দু-তিনবার আমরা এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। আজ ওর বাড়ি তো কাল আমার বাড়ি। এভাবে দিনের পর দিন রাতের পর রাত পার করে দিতাম।

বাকী, আমি আর রুবেল একসাথে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলাম ১৯৮৬  সালে। আমাদের উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জ বন্দরে বাকীদের বিশাল একটা দোতলা বাড়ি খালি পড়ে ছিল। আমরা ওই বাড়িতে থেকেই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলাম।

তারপর প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো একজন আরেকজনকে না দেখলে, আড্ডা দিতে না পারলে রাতে আমাদের ঘুম আসত না। একসাথে মঞ্চনাটক করা, ক্লাব, খেলাধুলা, বরিশাল থেকে ভিসিআর ভাড়া করে এনে ভিডিও দেখা, রাতভর টাস খেলা, সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মন চায়, আহ! আবার যদি পারতাম ফিরে যেতে সেই সোনালি স্বপ্নের দিনগুলোয়।

বাকীউল্লা ছিল লম্বায় ছয় ফুটের ওপরে। মাথাভরা চুল, সুন্দর চেহারার হ্যান্ডসাম তরুণ। সদা হাস্যোজ্জ্বল, খোলা মনের একজন ভালো মানুষ। একদিন সে একটা ব্লেড নিয়ে এসে পলাশকে বলল ওকে ন্যাড়া করে দিতে। যেই কথা সেই কাজ। মাথা ন্যাড়া করে একটা টোপার ক্যাপ পরে ওয়েস্টার্ন সিনেমার নায়ক মাথা ন্যাড়া টেলি সেভালাসের মতো হয়ে গেল। আমরা ওর নাম দিলাম ‘কোজাক’। তখন টেলি সেভালাসের জনপ্রিয় সিনেমা ‘কোজাক’ বিশ্বব্যাপী খুব জনপ্রিয়। বাকীর কোজাক হওয়ার পেছনের একটা ইতিহাস ছিল। কলেজের একটা মেয়ের সাথে ওর সম্পর্ক ছিল। মেয়েটার হঠাৎ করেই অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। বাকী মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসত, কিন্তু এতটা ভালোবাসত তা জানতাম না। তখনকার সময় প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মাথা ন্যাড়া করা  ছিল একটা ফ্যাশন। কিন্তু সেই ব্যর্থ প্রেম যে বাকীর সারাটা জীবন ধ্বংস করে দেবে, তা কে জানত। ওই বয়সে অনেকের জীবনেই এ রকম হয়, কিন্তু সেটা একটা সময় ওভারকাম করে সবাই আবার প্রেম করে, বিয়ে করে, সংসার করে কিন্তু বাকীর জীবনটা হয়ে গেল অন্য রকমের!
কিছু কিছু কষ্টের কথা আছে, যা মুখে বলে প্রকাশ করা যায় না। কেউ কেউ কেঁদে যায় সারা জীবন, কিন্তু কেউ তা দেখে না। বাকীর ভেতরে কষ্ট কতটা প্রখর ছিল, আমরা এত কাছে থেকেও তা উপলব্ধি করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। বন্ধু, তুমি আমাদের ক্ষমা করে দিয়ো।

একবার কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে বর্ষা নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় সালাম নামের এক ছাত্রের নিক্ষেপ করা বর্ষা এসে পড়ল রুবেলের রানের ঠিক মাঝখানে। আমি ছিলাম রুবেলের পাশেই। কট করে একটা শব্দ হলো। রুবেল মাটিতে বসে পড়ল। আমি বর্ষাটা টান দিয়ে বের করতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আমার শার্টপ্যান্ট লাল হয়ে গেল।  রক্ত দেখে আমার হাত-পা শীতল হয়ে গেল।
বাকী দৌড়ে এসে সিনেমার নায়কের মতো দুইহাতে রুবেলকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটল। আমাদের পেছন পেছন সালামও (যেই ছেলেটা বর্ষা নিক্ষেপ করেছিল) এল। কিন্তু হাসপাতালের করিডরে এসেই সালাম বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। বাকী এ অবস্থা দেখে সালামকে বলল, “দেখ, এখানে কোনো নাটক করবি না। মেজাজ খারাপ আছে, কী যে করে ফেলি জানিনা…।”

আমরা রুবেলকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বাকী গিয়ে ডাক্তারকে ধরে নিয়ে এল। ডাক্তার একটা লম্বা চিকন সিজার রুবেলের রানের ক্ষতের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। রুবেল ‘মাগো বাবাগো’ বলে চিৎকার কিরে উঠল। এসব দেখে আমার কপাল ঘামে ভিজে গেল। ডাক্তার বললেন, “রানের পুরো হাড়টা ভেঙে গেছে। আমরা এটার কিছু করতে পারব না। বরিশালে নিতে হবে।” আমরা রুবেলকে নিয়ে লঞ্চঘাটে গেলাম।  বাকী বলল, লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না।  স্পিডবোট ভাড়া করতে হবে। বাকী দৌড়ে গিয়ে একটা স্পিডবোট নিয়ে এল। বোটে ওঠার আগেই বোটের চালক বললেন, “পুরো টাকা আগে দিতে হবে, নইলে যাব না।” আমরা তিনজনই মানিব্যাগ বের করে যার পকেটে যা  ছিল, তা দিলাম। কিন্তু তাতেও তিনি রাজি হলেন না। বাকী বলল, “বাকিটা বরিশালে গিয়ে দেব।” কিন্তু বেটা নাছোড়বান্দা। পুরো ভাড়া না নিয়ে কিছুতেই যাবেন না। বাকী লোকটার শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, “এক্ষনি বোট ছাড়বি, তা না হলে তোরে রাইখ্যা আমি বোট নিয়ে যাব।” লোকটা ভয় পেয়ে বোট স্টার্ট দিল। রুবেলকে বরিশাল মেডিক্যালে ভর্তি করিয়ে দুই দিন পর আমি ও পলাশ চলে এলাম, কিন্তু বাকী রুবেলের সাথে বরিশালে থেকে গেল।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আমি ও রুবেল ভর্তি হলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাকী মানে আমাদের কোজাক ভর্তি হলো সিটি কলেজে। পলাশ থেকে গেল পাতারহাটে। কারণ, পলাশ আমাদের এক বছরের জুনিয়র ছিল। সে তখন ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল ইয়ারে পড়ে।

ঢাকায় একমাত্র পলাশদের ছাড়া আমাদের তিনজনের কারোরই নিজস্ব বাসাবাড়ি ছিল না। আত্মীয়স্বজনদের বাসায় থাকতাম। তাই গ্রামের মতো প্রতিদিন আড্ডা দেয়া হয়ে উঠত না। তখন মোবাইল ফোনের প্রচলন ছিল না। কিন্তু তাতেও আমাদের মাঝে বন্ধুত্বের বিন্ধুমাত্র দূরত্ব সৃষ্টি হয়নি। পলাশ সুযোগ পেলেই চলে আসত ঢাকায়। আমরা একসাথে হতাম, সিনেমা দেখতাম, আড্ডা দিতাম।

অনার্স শেষ করেই আমি চলে যাই জাপানে। সেখানে গিয়েও কোজাকের সাথে নিয়মিত চিঠি-চালাচালি হতো। তিন বছর পর জাপান থেকে ফিরে গিয়ে দেখলাম, কোজাক আগের মতোই আছে। শুধু একটু কথা বেশি বলে। এটা সে আগেও বলত, তবে এতটা নয়। চাকরিবাকরি কিছুই করে না। ঢাকা, খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। খুলনায় ওর বড় বোন থাকত। বোনের স্বামী পুলিশের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। গ্রামে ওদের প্রচুর অর্থসম্পদ ছিল, তাই চাকরিবাকরি না করলেও কোনো সমস্যা ছিল না। তাই বলে মানুষ কেউ বসে থাকে না। কিন্তু কোজাকের মধ্যে এ ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। বিয়েশাদির কথা বললে সে বলত, “আমাকে দিয়ে সংসার হবে না।” আমরা মনে করতাম, এ রকম সবাই বলে। তারপর সময় হলে ঠিকই বিয়ে করে, সংসার করে, কিন্তু কে জানত যে কোজাক আর দশজনের মতো নয়! সে যেটা বলেছে, সেটাই তার চিরস্থায়ী সিদ্ধান্ত। কারণ, কোজাক তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে বুকে বেঁধেছিল সমুদ্রসম স্বপ্ন। ঘর-সংসার, সন্তান হয়তো আরো অনেক কিছু। তার ভালোবাসা যখন অন্যের ঘর আলোকিত করতে ব্যস্ত, তখন কোজাকের জীবন অন্ধকারের চোরাবালিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তাই সংসার, সমাজ এসব তার কাছে অর্থহীন।

বাকীর ছবিটি দেখে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়েকবার দেশে গিয়েও ওর সাথে দেখা করতে পারিনি। বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনেছি, সে গ্রামে নেই। কোথায় থাকে কেউ জানে না। কিন্তু ইচ্ছে থাকলে ঠিকই খুঁজে বের করা যেত। সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে ক্ষেত্রে রুবেল অনেক বেশি দায়িত্ববান। ঢাকা থেকে গ্রামে বাকীর বাড়িতে যায়। সেখানে ওর সাথে দেখা করে আমাকে এই ছবিটা পোস্ট করে ভিডিও কল দিল। রুবেল বলল-
বাকী মানে আমাদের কোজাক এখনো বিয়ে করেনি।
কেন?
মেন্টাল অসুস্থ। আমাকেও চিনতে পারছে কি না বুঝতে পারলাম না। দেখলাম, কতগুলো ছেঁড়া কাগজের ওপর কী সব আঁকা-জোকা করছে আর একা একা কথা বলছে। দাড়ি-মোচ পেকে সাদা হয়ে আছে। মনে হয় দীর্ঘদিন শেভ করেনি। আমি বললাম, আমি রুবেল, আমাকে চিনতে পারছ? কোনো উত্তর নেই। আরো বললাম, বেলাল অস্ট্রেলিয়া থেকে তোমার সাথে কথা বলতে চায়। তবুও কোনো সাড়া নেই। এরপর আমি বললাম, চলো, আমরা বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি। এবার সে আমার সাথে বের হলো। আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক পথ এগোলাম, কিন্তু আমি খালাম্মাকে (ওর আম্মা) বলে আসিনি। তাই বললাম, তুমি একটু দাঁড়াও, আমি খালাম্মাকে বলে আসি। আমি বাড়ির ভেতর গিয়ে দেখি খালাম্মা আমার জন্য খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত। না খেয়ে আসতে দেবেন না। আমি আবার  বাড়ির সামনে রাস্তায় এলাম, কিন্তু সেখানে বাকী নেই। চারদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও পেলাম না। ভেতরে গিয়ে খালাম্মাকে বিষয়টি বললাম। তিনি বললেন, “তুমি ওকে খুঁজে পাবে না, বাবা। ও কখন কোথায় চলে যায় কেউ জানে না। ও তো সুস্থ নয়। আমার এত সুন্দর রাজকুমারের মতো ছেলেটা কেন যে এ রকম হয়ে গেল…।” খালাম্মা আঁচলে চোখ মুছলেন। আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। মনের অজান্তেই দুচোখে পানি চিক চিক করে উঠল।

রুবেলের কাছে কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভেজেনি। বাকশূন্য হয়ে স্তব্ধ হয়ে ছিলাম কিছুটা সময়। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। বাকীকে একবার দেখার জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠল।

কৈশোরের ভালোবাসার মাধুর্য মিশিয়ে নিটোল মুক্তোর মতোই চিরদিনের স্মৃতির মধ্যে অক্ষয় থেকে যায় যে সম্পর্ক, তার নাম বন্ধুত্ব। তাই তো শেক্‌সপিয়র বলেছিলেন-
প্রেম একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু বন্ধুত্ব নয়।

বন্ধু কোজাক, ভালোবাসা তোমাকে হারায়নি। ভালোবাসাকে তুমি হারিয়ে দিয়েছ। তুমি আছো, থাকবে বন্ধুত্বের মাঝে। চিরদিন। চির অম্লান।
তোমার সব বিষন্নতা, সব বেদনা, পুরানো বছরের সাথে মুছে যাক চিরতরে। দুঃখ হতাশা, না পাওয়ার কষ্ট সবটুকু ভুলে গিয়ে নতুন বছরটা সাজাও নিজের মত করে।

নতুন বছরে আল্লাহ তোমাকে ভাববার শক্তি দিক, নতুন করে ভালোবাসা দিক। যে ভালবাসা তোমাকে নতুন করে বাচার স্বপ্ন দেখাবে।
নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ
শুভ হোক তোমার জন্য।

বেলাল হোসেন ঢালী : উপদেস্টা  সম্পাদক, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম
অস্ট্রেলিয়া

(লেখাটি এতটাই হৃদয়ছোঁয়া যে, দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশের পরও লেখক-এর অনুমোতি স্বপেক্ষে বাংলারিপোর্ট-এর পাঠকদের জন্য নিবেদিত হলো)