‘ফ্ল্যাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ওয়াটার লগিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করেছে চসিক….

ইব্রাহিম খলিল প্রধান, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে ভেসে একাকার হয়ে যাওয়া নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকায় একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ‘ফ্ল্যাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ওয়াটার লগিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক এ প্রকল্পে ‘জিটুজি’ (গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট) পদ্ধতিতে অর্থায়ন করবে চীন। ইতিমধ্যে ৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এ প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিও (সম্ভাব্যতা যাচাই) শেষ হয়েছে। কাজ শুরুর তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় নগরীর ২৭টি খালের মুখে স্লুইস গেইট নির্মাণ এবং ড্রেজিং করা হবে। এছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখে পাম্প স্টেশন স্থাপন, কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সড়ক পর্যন্ত বাঁধ তৈরি এবং বাঁধের উপর সড়ক নির্মাণসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হবে। এই বাঁধের উপর নির্মাণ করা হবে চার লেন বিশিষ্ট সড়ক। এই অংশে ৫টি ব্রিজ, ১২টি স্লুইসগেইট নির্মাণের পাশাপাশি নদীর তীর রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ ছোট খালগুলোও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নেভাল একাডেমি থেকে ১০ নম্বর খাল পর্যন্ত ৫ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার অংশে কংক্রিটের তৈরি ঢেউ প্রতিরোধক দেয়াল নির্মাণ করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। এই দেয়াল চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরকে রক্ষা করবে বলেও প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় হালদা এবং কর্ণফুলী নদীর শাখা হিসেবে নগরীতে প্রবাহিত ২৭টি খালের মোহনায় স্লুইসগেইট নির্মাণের পাশাপাশি বাঁধের তলদেশে ১০টি কালভার্ট নির্মাণেরও সুপারিশ রয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্টে।

এছাড়া পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যাওয়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি খাল এবং মধ্যম সারির খালগুলোও সংরক্ষণ করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। এক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১১টি খালের ড্রেজিং করা হবে। এছাড়া মহেশখালের ৯ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার অংশজুড়ে ড্রেজিং এবং বাঁধ নির্মাণ করা হবে। খালটির দুই পাশে সবুজায়ন এবং সৌর্ন্দযবর্ধন করা হবে বলে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে রাজাখালী খালের ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার জুড়ে ড্রেজিং করা হবে এবং খালের দুইপাশে বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে গৃহীত প্রকল্পের আওতায় বহাদ্দারহাট বারৈপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন করার কথা আছে। ‘ফ্ল্যাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ওয়ারটার লগিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ প্রকল্পের আওতায় এ খালের গতিপথ সোজা করা হবে। এজন্য ২ দশিক ৯ কিলোমিটার খালটির (বহাদ্দারহাট বারৈপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী) দুটি অংশকে সোজা করার জন্য ২শ মিটার নতুন করে খনন করা হবে। পাশাপাশি নতুন করে খালটির চাঁদমিয়া রোড এলাকা থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ১৬ কিলোমিটার অংশের প্রশস্থতা বৃদ্ধি করা হবে। নতুন খালটির নিম্নাংশের ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় মহেশখালের মোহনা, এবং মহেশখাল থেকে সমুদ্রমুখী ডাইভারসন খালের মোহনায় পাম্প হাউস নির্মাণ করা হবে। একইভাবে রাজাখালী খাল, চাক্তাই খালের মোহনায়ও পাম্প হাউজ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া পয়ঃনিষ্কাশনে স্যুয়ারেজ প্ল্যান্ট, স্যুয়ারেজ পাম্প স্টেশন এবং পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপও স্থাপন করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়।

প্রকল্প সম্পর্কে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি রিপোর্ট পেয়েছি। এর আলোকে আমরা ডিপিপি তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে আগামী সাত-আট মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পাবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানও হবে। আমরা করছি চট্টগ্রামবাসীর কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবেন। মেয়র বলেন, ‘আমার জানা মতে আমার পূর্বে কোন মেয়র এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এবং ড্রেনেজ স্পেশালিস্ট মো. হুমায়ূন কবির বলেন, ‘১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা বলে থাকি সমন্বয়ের অভাবে এটা হয়নি। চট্টগ্রাম ওয়াসাও একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির জন্য স্ট্যাডি করছে। চাইনিজরা এখন যে স্ট্যাডি করেছেন সেটা ওয়াসার স্ট্যাডির আলোকেই। চাইনিজদের ফিজিবিলিটি রির্পোট ডিটেইলস পাইনি। পেলে বুঝতে পারবো ওয়াসার যে স্ট্যাডি তার সাথে এটার কোথাও গ্যাপ রয়েছে কী না। পরে যেখানে সমস্যা থাকবে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। এইক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক কিছু নেই।’

তিনি বলেন, ‘দুটো কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। প্রথমে বৃষ্টি এবং দ্বিতীয়ত জোয়ারের পানি শহরে প্রবেশ করা। বৃষ্টির জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টির কারণ হচ্ছে নালা-নর্দমার যে ক্যাপাসিটি থাকা দরকার তা নেই। আবার খালের কিছু কিছু জায়গায় কালভার্ট আছে যেগুলোর সাইজ খালের চেয়ে ছোট। অন্যদিকে সেবামূলক সংস্থা যেমন ওয়াসা, বিদ্যুৎ, টিএন্ডাটি, গ্যাসের পাইপলাইনগুলো যেভাবে নেয়া উচিত সেভাবে নেয়া হয় নি। এগুলোও বর্জ্য আটকে পানির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে। আবার বৃষ্টির সময় জোয়ার থাকলে বৃষ্টির পানি নদীতে প্রবাহিত হতে পারে না। তখন উল্টো প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে পাম্পস্টেশন প্রয়োজন। শহরে পাহাড়গুলো যেহেতু বালিযুক্ত তাই সিল্টট্রাপ বা গার্ভেজ কালেকশন পয়েন্ট করতে হবে। এগুলো করতে পারলে চট্টগ্রামকে বন্যামুক্ত করতে না পারলেও বন্যাকে সহনীয় করা যাবে।’

চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাথে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল চসিক। ওই চুক্তিতে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে নগরীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ৭০ শতাংশ নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল চসিক। পরবর্তীতে ‘ফ্ল্যাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ওয়ারটার লগিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নামে একটি প্রকল্পের ‘পিডিপিপি’ তৈরি করা হয়।এদিকে ২০১৬ সালের ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল চীনের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ লিমিটেডের সাথে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প গ্রহণে চসিক সমাঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনের প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক বছর ধরে নগরীর বিভিন্ন খাল ও নালা-নর্দমার উপর জরিপ চালায়। সর্বশেষ রবিবার চসিক মেয়র আ জ ম নাছিরের হাতে প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি রিপোর্ট তুলে দেয়।

২৪/৪/২০১৭/৫০/