এপ্রিল 03

নরকের রাজপথ অলস…

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমcropped-logo-banglareport-1.png

একটি গল্প দিয়ে আলোচনা শুরু করি- গ্রামের একজন কুঁড়ে লোক একবার মোল্লা নাসিরউদ্দিনকে বলল, ভাই, নাসিরউদ্দিন আমি কাল তোমার বাড়িতে খেতে চাই। তোমার স্ত্রীকে বলো ভালো খাবার রান্না করতে। নাসিরউদ্দিন রাজি হয়ে গেলেন।পরের দিন ঐ কুঁড়ে নাসিরউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে চিৎকার করে বলল, শিগগির এক বদনা জল নিয়ে এসো আমি হাত ধুয়ে তারপর খাবো। নাসিরউদ্দিন এক বদনা জল এনে ঐ লোকের হাতে জল ঢালতে ঢালতে বললেন, দুঃখের কথা খাবার এখনো তৈরি হয় নি।

সে জিজ্ঞেস করল- কী? কেন? হোজা বললেন, সবই তৈরি আছে। শুধু একটি জিনিসের অভাব। লোকটি বলল, কী সে জিনিস? হোজা কানের কাছে মুখ এনে বলল, শুধু কাজ করা হাতের অভাব।

এটি হচ্ছে আলস্য। আমরা সবই করতে পারি কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজটি করার সময় আমাদের কেন যেন শক্তি, সামর্থ্য, ইচ্ছাশক্তি বিমুখ হয়ে যায়। আমরা এগুলো ব্যবহার করতে পারি না।

আমাদের এখনও সামগ্রিকভাবে প্রিয় গানের তালিকায় একটি গান হচ্ছে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’….. অর্থাৎ শুধু আড্ডা দিতে পারছি না এজন্যে আফসোস।

আসলে যে-কোনো জাতি হোক, ব্যক্তি হোক, পরিবার হোক তাদের উত্থান হয় আলস্যের বিপরীতে কাজ করে। আর পতন হয় আলস্য থেকে।

আলস্যকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে, সময়ানুবর্তী হয়ে সুনির্দিষ্ট ও কল্যাণকর ফলপ্রসূ কাজ না করার নামই আলস্য। আমাদের জীবনে আলস্য রয়েছে অনেক রূপে।

মানসিক আলস্য যেমন সৃজনশীল কাজ যেটাতে মানসিক শক্তি ব্যয়ের প্রয়োজন হয় তেমন কাজ নিজেরা না করে অন্যের চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া। এর আরেকটি প্রকাশিত রুপ হচ্ছে ফেসবুকে আসক্তি, মোবাইলে রাত জেগে কথা বলা, টিভি সিরিয়ালে বুদ হয়ে থাকা, ইন্টারনেটে চ্যাটিং করা।

শারীরিক আলস্যের কথা বলতে পারি একটি গল্প দিয়ে। এটি বিখ্যাত পিপো ফিশো’র গল্প। জনৈক রাজা তার অলসখানায় অলস পুষতেন। দুই রাজ্যে অলস প্রতিযোগীতা হবে। তাই ভালো ভালো অলস লোক বেছে নিয়ে আসা হয়েছে। এদিকে ফ্রি খানা দানা, থাকা খাওয়ার লোভে কিছু ভেজাল অলস রাজার অলসখানায় ঢুকে গেছে। রাজা দেখলেন- এ তো সমস্যা। কারণ এতে অলসখানার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তিনি এ নিয়ে মন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করলেন।

ভেজাল অলস খুজেঁ বার করার জন্যে মন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী অলসখানায় দিলেন আগুন লাগিয়ে। এদিকে আগুন লাগানো মাত্রই যারা ভেজাল অলস প্রথম দফাতেই তারা দৌড়ে চলে গেলেন। এভাবে আগুনের ভয়ে একের পর এক অলস চলে যাওয়ার পর দেখা গেল ঘরের শেষ প্রান্তে আগুন পৌঁছে গেছে। কিন্তু তখনও ঘরের মধ্যে পাশাপাশি একজোড়া খাটের মধ্যে দু’জন শুয়ে রয়েছে।

আগুন সেদিকে যাচ্ছে কিন্তু তাদের উঠার কোনো ভাব নেই। এর মধ্যে একজন বললেন- ‘পি পো’। এটা শুনে অপরজন বললেন- ‘ফি শো’। [‘পি পো’ মানে পিঠ পোড়ে, ‘ফি শো’ মানে ফিরে শোও]। রাজা দেখলেন মুখের পরিশ্রম হবে দেখে এরা কথা বলে ছোটো করে আর গায়ে আগুনের উত্তাপ লাগার পরও তারা নড়লো না। তাই এরাই আসল অলস। তারপর রাজা বললেন, তোমরা দুজন থাকো বাকিরা সব বিদায় হও।

আসলে যত সভ্যতার অবদান বাড়ছে, নানা আবিস্কার সামগ্রী জীবন সহজ করে দিচ্ছে, তত আমাদের পিপো ফিশো’র যুগে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যেমন আমরা না পারতে এখন হাটি না। ডাক্তার যখন বলেন অবশ্যই হাটতে হবে, তখন হাটি।

আলস্যের প্রধান কারণ লক্ষ্যহীনতা। আসলে যাদের জীবনে কোনো লক্ষ্য নাই, মহৎ কিছু করার কোনো অনুপ্রেরণা নাই, কোনো উদ্যম নাই, পরিবর্তনের কোনো স্পৃহা নাই। তিনি শুয়ে বসে অনর্থক চিন্তা করে দিন কাটিয়ে দেবেন।

আর যদি জীবনে লক্ষ্য থাকে যে আমি এই হতে চাই, এটা অর্জন করতে চাই তাহলে দেখা যাবে সেই লক্ষ্য তাড়না দিচ্ছে আমাকে কাজ করার। আর সেই কাজটিও করা হবে শ্রমানন্দে।

কিন্তু লক্ষ্য না থাকলে অবস্থা হবে সেই পাঠান যুবকের মতো-সে সারাদিন কোনো কাজ না করে শুধু বড়শি পেতে মাছ ধরে। এক মুরুব্বি তার এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করে-তুমি এভাবে সময় না কাটিয়ে পড়াশুনা করতে পারো। জবাবে পাঠান যুবক বলল, পড়াশোনা করে কী হবে? মুরুব্বি বললেন, বড় চাকরি করবে, চাকরি হলে ভালো বিয়ে করবে, ছেলে-মেয়ে হবে, নাতি-পুতি থাকবে। অবশেষে আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করবে। সব শুনে যুবক বলল, সে তো আমি এখনই করছি। তার জন্যে এত কষ্ট করার প্রয়োজন কী?

লক্ষ্যহীনতার পাশাপাশি আলস্যের ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। যেমন:
কাজের ক্ষেত্রেও আমরা মনে করি, যত কম পরিশ্রম, যত কম কাজ তত ভালো তত আরাম। আমরা এমন চাকরি খুঁজি যেখানে ডেস্কে বসে কাজ করা যায়। জীবনের সবচে উদ্যম, কর্মব্যস্ত সময়ে যেখানে দুরন্ত হয়ে ছোটার কথা সেখানে এমন ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি লজ্জার নামান্তর।

ইতিহাস বলে মুঘল সম্রাটরা সাম্রাজ্য বাড়ানো বা রক্ষা করার জন্যে প্রয়োজনীয় পরিশ্রম না করে বিলাসিতা, আলস্য এবং অপব্যয় করেছিলেন। তার পরিণতি ছিল বড় একটি সাম্রাজ্যের পতন।

অপরদিকে জাপান আজকে পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছ শুধু নিরলস কাজের মাধ্যমে। আসলে কাজ প্রিয় প্রতিটি জাতি যুগে যুগে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছে।

দার্শনিক কনফুসিয়াস খুব সুন্দর করে বলেছেন, Success depends upon previous preparation, and without such preparation there is sure to be failure. অলস মানুষ এই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি টুকু নিতে পারে না যে কারণে তারা সফল হতে পারে না।

আরেকটি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে- আমার কাজ অন্যে করে দেবে। কিন্তু অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে কত দূর যেতে পারব আমরা? কারণ আমাদের প্রত্যেকে কর্ম অনুযায়ী কর্মফল ভোগ করতে হবে। শেষ বিচারের দিন স্রষ্টাও আমাদের প্রতিটি কাজের হিসাব নিবেন নিখুঁতভাবে।

আবার অন্য কেউ কাজ না করে দিলেও আল্লাহ ঠিকই করে দিবে। এই ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির মূলেও রয়েছে আলস্য। অথচ স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কষ্ট ও পরিশ্রমনির্ভর করে।

এই যে এত ধরনের আলস্য এটি কাদের মধ্যে থাকে এ ব্যাপারে সেই কয়েক হাজার বছর আগে মহামতি বুদ্ধ খুব সুন্দর একটি কথা বলেছেন।মূর্খরা আলস্যে নিপতিত হয়। প্রাজ্ঞরা সচেতন প্রয়াসে সৎকর্মে সদা তৎপর থাকে।

আলস্যকে যদি আমাদের মাঝে জমতে দেই তবে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত সবক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।

মানসিক ক্ষতি হতে পারে এভাবে যে আমাদের চিন্তা শক্তি কমতে থাকবে। এক্ষেত্রে দেখা যাবে একটি ভালো বই বা গভীর চিন্তা সমৃদ্ধ কোনো আর্টিকেল পড়া, গবেষণামূলক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। তখন চাইলেও মনে সুচিন্তা না এসে কুচিন্তা চলে আসবে।

শারীরিক ক্ষতি হতে পারে রোগযন্ত্রনায় জর্জরিত হয়ে। কারণ পরিশ্রম এবং ব্যায়াম না করার জন্যে দেহের ইর্ন্টানাল এক্সাটার্নাল অঙ্গ রোগগ্রস্ত হয় সহজে। যা আমাদের দ্রুত অর্থব করে তুলে। পরিশেষে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগ হয়।

একইভাবে ডায়বেটিস রোগী হলে হাটাহাটি না করলে সুগার বেড়ে যাবে, স্টুডেন্ট হলে- পড়ালেখা না করলে, পরিশ্রম না করলে রেজাল্ট খারাপ হবে, চাকরিজীবি হলে কাজ বন্ধ করে দিলে সর্বনিম্ন হচ্ছে প্রমোশন আটকে যাবে, সর্বোচ্চ হচ্ছে চাকরিটি চলে যেতে পারে। আর ব্যবসায়ী হলে যদি আলস্যে ভুগতে থাকে তবে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।

এই ক্ষতিগুলোর পাশাপাশি আরো কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস ঢুকে যেতে পারে যদি অলসতা থাকে।

যেমন, দি ডেইলি স্টার-এ একটি রিপোর্ট এসেছে Yaba Menace : Victims of ‘nothing to do’ Syndrome. এখানে বলা হয়েছে যে আজকে উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুন-তরুণীদের করার মতো কোনো কাজ নেই। তাই তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে নিছক আনন্দ উপভোগের জন্যে। তাই কাজ না থাকা বা কাজের পরেও অলস সময় থেকে যাওয়ার ফল হচ্ছে এমন সর্বনাশা জীবন।

আর এই নেশাময় জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হচ্ছে মাদকাসক্ত কন্যার, মা-বাবাকে হত্যা করার মতো মর্মান্তিক ঘটনাটি।

এছাড়া আরো একটি ভ্রান্ত জীবন অভ্যাস চর্চা করতে দেখা যায় আমাদের দেশে মহিলাদের মধ্যে, যার মূলে রয়েছে আলস্য। এই যেমন এই মহিলাদের একটি বড় অংশ সপ্তাহে ৪০-৪৫ ঘন্টা টিভি দেখে সময় কাটায়। প্রেম, পরকীয়া, ভায়োলেন্স, কূটচাল, হিংসার মতো নেতিবাচক আবেগ ও ঘটনা সমন্বিত হিন্দি ও বাংলা সিরিয়ালগুলো তাদের পছন্দের টিভি প্রোগ্রামের শীর্ষে। যার ফলাফল হচ্ছে সংসারে অশান্তি, সন্দেহপ্রবণতা বৃদ্ধি, হিংসাত্মক কর্মকান্ড বৃদ্ধি, মনোবৈকল্য।

অলসতা এভাবেই আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এভাবেই অলসতার রাজপথ ধরে হাটতে হাটতে আমরা নরকের দিকে এগিয়ে যাই।

আসলে আমাদের জীবনটা একটা মোমবাতির মতো। যখন মোমবাতিটা জ্বালানো হলো তখন জীবন শুরু হলো। এরপর আমরা চাই বা না চাই একসময় মোমবাতি যেমন জ্বলতে জ্বলতে শেষ হয়ে যায় তেমনি আমাদের জীবন প্রদীপও নিভে আসবে। চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে।

তাই আমরা মোমবাতিটা কীভাবে জ্বালাবো অর্থাৎ আমরা কীভাবে জ্বলতে চাই, কীভাবে আমাদের সময় ব্যয় করতে চাই, কীভাবে কাজগুলো করতে চাই। এজন্যে সচেতনভাবে চিন্তা করে লক্ষ্য নির্ধারন করা খুব জরুরী। আর এ পথে সবচে বড় যে বাধা তা হলো আলস্য।

আর আলস্য কখনো কথার মাধ্যমে দূর হয় না। দূর হয় কাজের মাধ্যমে। তাই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে। যত দ্রুত কাজ শুরু করবো তত দ্রুত আলস্য অতিক্রম করতে পারব।

সবসময় বিশ্রাম না খুঁজে নিজের কাজ যথাসম্ভব করতে হবে নিজে নিজে। এতে শরীর কাজে অভ্যস্ত হয়ে পরে।

বাড়াতে হবে শারীরিক পরিশ্রমের পরিমান। পাশাপাশি নিজের শরীরের যত্ন, দম চর্চা, ব্যায়াম ও মেডিটেশন করতে হবে। মস্তিষ্কে সেরোটনিনের প্রবাহ বাড়ায় মেডিটেশন। ফলে সুখ সুখ অনুভূতি তৈরি হয় মনে। তখন কাজও করা যায় শ্রমানন্দে, যা অনুভূতি দেয় লক্ষ্য জয়ের, দূর করে যখন যা ইচ্ছা তা করার প্রবণতা, বিদায় করে জীবন থেকে অলসতাকে আর বরণ করে সাফল্যকে।

 

৩/৪/২০১৭/২৩০/তৌ/আ/