নববর্ষে ইলিশের পান্তায় তেলাপিয়া মিলিয়ে পান্তাপিয়া…১৪২৪

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম  দেখতে দেখতে ঘনিয়েhilsha এল ১৪২৩ বঙ্গাব্দের বিদায় ক্ষণ। আর ক’দিনের মধ্যেই আমরা স্বাগত জানাব নতুন বছর ১৪২৪ বঙ্গাব্দকে।অস্বীকার করে লাভ নেই যে, আমাদের লাইফ স্টাইলের সাথে বাংলার চেয়ে ইংরেজি বছরটাই জুড়ে আছে অনেক বেশি। ২৫ শে বৈশাখ, ১১ ই জ্যৈষ্ঠ, ২২ শে শ্রাবণ বা ১ লা বৈশাখ – এরকম গুটিকয় বাংলা তারিখকেই সম্ভবত সারা বছরে আমরা মনে করি। (অবশ্য ব্যতিক্রম কেউও থাকতে পারেন, তবে সেটা ব্যতিক্রমই)।

যাই হোক, বর্ষবরণের এই দিনটি সারা দেশের মানুষের মতো আমরাও পালন করি আনন্দ, উদ্দীপনা, আশা আর বিশ্বাসের অনুভূতি নিয়ে। তবে অবিদ্যা আর সংস্কারের জাল ছিন্ন করার যে অগ্রণী ভূমিকা কোয়ান্টাম সবসময় পালন করেছে, তার অংশ হিসেবে বছর চারেক ধরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি চর্চা।

২০১৩ সালে প্রথম কোয়ান্টাম ঘোষণা করল নববর্ষের মেন্যু থেকে ইলিশ বর্জনের এবং বিকল্প হিসেবে তেলাপিয়ার। পান্তার সঙ্গে তেলাপিয়া মিলিয়ে পান্তাপিয়ার এক সহজ ও সুলভ মেন্যুও প্রস্তাব করল কোয়ান্টাম।

 

কোয়ান্টাম আজ যা বলে, সচেতন সমাজ তা গ্রহণ করে। এ বাণীর যথার্থতা মিলল গত বছর, মানে ২০১৬ সালে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সর্বস্তরেই এ বছর পান্তা-ইলিশের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা দেখা গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা দিলেন, নববর্ষ উদযাপনের দিন খাদ্য তালিকায় ইলিশের কোনো পদ তিনি রাখবেন না।

উল্লেখযোগ্য হলো, জনমানসে এই ইতিবাচকতার অনুরণন লাগল প্রকৃতিতেও। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের গবেষণায় দেখা গেল, বাংলাদেশের সীমানার ভেতর ধরা পড়া ইলিশের আকৃতি ও ওজন বাড়ছে। ২০১৩ সালে যেখানে একটি ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫১০ গ্রাম। ২০১৫ সালে সে ইলিশের ওজন হলো ৬২৮ গ্রাম।

আসলে পৃথিবীর যে ১২টি দেশে এখন ইলিশ হয়,তার ৭০ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। এর কারণ হলো আমাদের বঙ্গোপসাগর। এর পলিবিধৌত মহীসোপানকে বলা হয় ইলিশের শ্রেষ্ঠ চারণভূমি। এত অনুকুল আবাস, ইলিশের জন্যে এত ভালো খাদ্যের সংস্থান নাকি পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

 

ওয়ার্ল্ড ফিশের গবেষণাতেই উঠে এল ‘অন্য সব দেশে যখন ইলিশের উৎপাদন কমছে, তখন বাংলাদেশে এ উৎপাদন বাড়ছে’। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে,২০১৫ এর তুলনায় ২০১৬ তে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ পাওয়া গেছে ২০ শতাংশ বেশি!

এখন দরকার একটু সচেতনতা। পাঠক হয়তো জানেন, একটি মা ইলিশ একবারে ১০ থেকে ৩০ লক্ষ পরিমাণ ডিম পাড়ে! ভাবতে পারেন? আপনার খাবার টেবিলে ইলিশের ডিম ভাজার যে পদটা আছে, রান্না না হলে ওটা থেকে ৩০ লক্ষ না হলেও নিদেনপক্ষে ১০ লক্ষ ইলিশ হতো!

শুধু আপনাদের বলছি কেন? আমরাও তো ইলিশের ডিম খেয়েছি! তখন বুঝি নি। এখন বুঝি। কাজেই এখন খেলে এটা অন্যায় হবে। স্ববিরোধিতা হবে!

 

যাই হোক, শেষ করি, বিশেষজ্ঞদের কথা দিয়ে। তারা বলছেন, বৈশাখের সাথে ইলিশ খাওয়ার কোনো সম্পর্ক কোনোকালেই ছিল না। এই বানোয়াট সংস্কৃতি চালু করে ৯০ দশকে আমাদের দেশেরই মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। উদ্দেশ্য, ইলিশকে দুষ্প্রাপ্য করে ‘দুর্মূল্য’ করা। পরিণামে লাভবান হবে ওরাই।

বলা বাহুল্য, তারা সফল হয়েছিল। একজোড়া ইলিশের দাম নাকি লক্ষ টাকা – বাজারের এমন খবরও শোনা গেছে একসময়। তবে আশার কথা হলো, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভ্রান্ত রীতি পুরোপুরি বন্ধ হলে বছরে চার লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ইলিশ পাবে বাংলাদেশের মানুষ! রূপালি অর্থনীতির সম্ভাবনা বাড়বে। সমৃদ্ধ হবে ইলিশ-নির্ভর দেশীয় জিডিপি।

শুভ নববর্ষ ! শুভ হোক পান্তাপিয়া!

শুভ নববর্ষ। বিদায় নেবে বর্ষ ১৪২৩। শুরু হবে বাংলা বর্ষ ১৪২৪। এটা ঠিক যে, বাকি দুনিয়ার সাথে তাল রাখতে গিয়ে আমাদের নগর জীবনে ইংরেজি বছর যেভাবে জড়িয়ে গেছে, বাংলার বেলায় তেমনটি হয় নি। কিন্তু পয়লা বৈশাখ মানে পয়লা বৈশাখই। যত সময় যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে এ উৎসবটির উপস্থিতিতে আয়োজন আর আড়ম্বর যেন তত বাড়ছে।

চাইনিজ নিউ ইয়ারের সময় সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ায় ছিলাম। চীনা নববর্ষ উৎসবের গল্প আগে শুনেছি। শুনেছি নাকি ভীষণ আড়ম্বর হয়। সপ্তাহজুড়ে সবকিছু বন্ধ থাকে। মানুষজন শুধু উৎসব আর আয়োজনেই মেতে থাকে।

এবার বাস্তবে দেখলাম। সত্যিই খুব ফেস্টিভ। এক সন্ধ্যায় জাহাজ থেকে আমরা নেমেছিলাম মালয়েশিয়ার পেনাং বন্দরনগরীতে। হাঁটবো কি, রাস্তাজুড়ে উৎফুল্ল জনতা নাচছে, গাইছে। আমাদেরকেও ধরে ফেললো। উৎসবমুখর জনতার স্রোতে আমরা মিশে গেলাম।

 

কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, বাঙালির বাংলা বর্ষ উদযাপন অনেক বেশি গভীর। আমাদের উদযাপনে আড়ম্বর থাকুক না থাকুক, আন্তরিকতা আছে পুরোটাই।

গতকাল পাড়ার একটা কাপড়ের দোকানে গিয়েছিলাম। সস্তার কাপড় বিক্রি হচ্ছে। এক বাবা এসেছেন স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে। বেশভূষাই বলছে হয়তো আধাসরকারি অফিসের সেকেন্ড ক্লাস কর্মচারি। আড়চোখে দেখছিলাম একটা একটা করে সবার জন্যেই তিনি বোশেখী কাপড় কিনলেন। সস্তা হোক, কিন্তু বোশেখী তো।

১ লা বৈশাখের দিন নিশ্চয়ই তার বাড়িতে বিশেষ কিছু রান্না হবে। সেই বিশেষ কিছুটা পান্তা-ইলিশ কি না আমরা জানি না। কারণ দুমূল্যের কারণে তার মতো লক্ষ লক্ষ সাধারণ আয়ের মানুষের কাছে ইলিশ এখন মহার্ঘ্য।

এই মানুষগুলোর জীবনেই কিছুটা সস্তি এনে দিতে গতবছর থেকে আমরা পান্তাপিয়া দিয়ে উদযাপন করছি আমাদের নববর্ষকে। পান্তাভাত আর আস্ত তেলাপিয়া ফ্রাই, সাথে কড়া করে ভাজা আলুকুচি, পেয়াজ আর টালা শুকনো মরিচ – ব্যস এই হচ্ছে পান্তাপিয়া।
নববর্ষের প্রভাতেই এই মেনু দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের ঘোষণা দেন গুরুজী শহীদ আল বোখারি মহাজাতক। তখন ঢাকায় চলছিলো কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশন কোর্সের ৩ য় দিনের ক্লাস। দুপুরে কোয়ান্টিয়াররা সবাই মিলে উপভোগ করেন এই পান্তাপিয়ার রেসিপি – পানিভাত, আস্ত একটি তেলাপিয়া ভাজা, ভাজা আলুকুচি, মরিচ আর পেঁয়াজ।

প্রস্তুতির অভাবে অবশ্য বৃহত্তর কোয়ান্টাম পরিবারের সবাই ঐদিনই পান্তাপিয়া দিয়ে বৈশাখী আয়োজনে শামিল হতে না পারলেও পরদিন বা তারপরে অনেকেই খেয়েছেন এই নতুন মেনু। তারা সবাই খুবই উচ্ছ্বসিত। শুধু কোয়ান্টাম সদস্যরাই নন, যারাই শুনেছেন তারাই উৎসাহিত হয়েছেন বৈশাখের এ নতুন মেনুতে। বলছেন দুর্মূল্যের এ বাজারে তেলাপিয়ার মতো সুলভ মাছ দিয়ে যে এমন সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা করা যায়, তা ধারণাতেই ছিলো না।

প্রিয় পাঠক, আসুন এবারের নববর্ষে পান্তাপিয়া দিয়েই সাজাই আমাদের বোশেখী মেনু। সবাই মিলে উপভোগ করি নববর্ষ উদযাপনের আনন্দ।

‘পান্তাপিয়া’

উপাদান:

পান্তাভাত
তেলাপিয়া মাছ ভাজা (পেঁয়াজ বেরেস্তা থাকতে পারে)
পোড়া আলু ভাজা [কুচি কুচি করে কাটা আলু, তেল, পেঁয়াজ (সাথে হালকা মশলা থাকতে পারে) মরিচ দিয়ে ভাজা]
শুকনো মরিচ টালা বা তেলে ভাজা / কাঁচামরিচ
কাঁচা পেঁয়াজ টুকরো

৩/৪/২০১৭/১০/তৌ/আ/