এপ্রিল 29

দেশ সেরা তিন নারী রিকশা চালক…

মনির জামান, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

বাংলাদেশী নারীরা এখন আর ঘরের পণ্য নয়। তারা এখন আর সীমাবদ্ধ নয় ঘরের কাজে। তারা শুধু ঘরের বাইরেই যায়নি, নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। আবার অনেকে সমাজে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। গার্মেন্টস কর্মী হতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের একেবারে শীর্ষ পদে নারীদের অংশগ্রহণ এখন আর নতুন কিছু নয়। সবখানেই তারা দেখিয়ে দিচ্ছেন দক্ষতার দিক থেকে পুরুষের চেয়ে তারাও কোন অংশে কম নয়। তবে সব কর্মক্ষেত্রে নারীর দেখা মিললেও রিকশাচালক হিসেবে তাদের নাম আগে কখনো শোনা যায়নি। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। রিকশা চালিয়েও তারা নিজেরা নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন। দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় এসব নারীরিকশা চালকের দেখা পাওয়া যাচ্ছে ইদানিং। সুমী বেগম, জেসমিন এবং লিপিকা অধিকারী তেমনই নারী। যারা ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং চাঁদপুর এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

এসব নারী রিকশাচালকের মধ্যে ৪৫ বছর বয়সী চট্টগ্রামের জেসমিন সবার অগ্রগণ্য। মাত্র পাঁচ বছর আগের ঘটনা। জেসমিনের এক প্রতিবেশী তার নিজের রিকশাটি চালাতে বলে। সেই থেকে জেসমিন বন্দর নগরী চট্টগ্রামে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেসমিন বলেন, আমি রিকশা চালানো শুরু করেছি মূলত দুটি কারণে। নিজের প্রয়োজন মেটাতে এবং ছেলেমেয়েদের পড়া‡লখা করানোর উদ্দেশ্যে। তিনি বলেন, আমার স্বামী যখন আমাকে রেখে অন্য নারীকে বিয়ে করে চলে যায়, তখন আমি তিন সন্তানসহ দুর্বিসহ জীবন কাটিয়েছি। তাদের খাবার যোগাড় করতে মানুষের বাড়িতে কাজ করেছি। পরে গার্মেন্টসেও কাজ করি। কিন্তু সবখানেই অল্প টাকার বেতন যা দিয়ে আমার পক্ষে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। পরে আমি রিকশা চালাতে শুরু করি।

জেসমিন বলেন, গড়ে এখন আমার দিনে ৬শ’ টাকা আয় হয় আট ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে। রিকশা মালিককে ১শ টাকা জমা দিয়ে থাকে ৫শ টাকা। সব দুর্দিন শেষ করে জেসমিন এখন বন্দর নগরীতে পরিচিত এক মুখ।

সুমি বেগম ২০১৪ সালে যখন স্বামীর সংসার ছেড়ে আসেন তখন তিনি তিন মাসের গর্ভবতী। যখন বুঝতে পারেন তার স্বামী শুধু মাদকাসক্তই নন তার রয়েছে বেশ কয়েকটি পরকীয়া সম্পর্ক, তখন আর দেরি না করে সিদ্ধান্ত নেন স্বামীকে তালাক দেয়ার।

মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার রমজানপুর এলাকার গৃহিনী সুমি বাচ্চাকে মায়ের কাছে রেখে সব কিছু ছেড়ে ২০১৫ সালে চলে আসেন ঢাকায়। কেরানীগঞ্জ এলাকার একটি বাড়ীতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন সুমি। কিন্তু অল্প দিনেই বুঝতে পারেন এখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তার সংসার চলবে না। তার সন্তান বৃদ্ধা মা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাইয়ের খরচ চালাতে হলে তাকে আরো বেশি উপার্জন করতে হবে। ২০১৬ সালের শুরু দিকে সুমি সিদ্ধান্ত নেয় রিকশাভ্যান চালানোর। শুরুও করে দেয় রিকশাভ্যান চালানো। অল্প কিছুদিনের মধ্যে পুরান ঢাকা এলাকায় সুমি হয়ে উঠে সবার পরিচিত মুখ যে কিনা একমাত্র নারী ভ্যানচালক। ভ্যানের ভাড়া পরিশোধ করে প্রতিদিন গড়ে তার আয় হয় ৩শ’ টাকা। সুমি বলেন, সংসারের খরচ চালানোর জন্যই আমি ভ্যান চালাই। কিন্তু আমার মেয়ে যেন আমার মত রিকশা না চালায়। আমার স্বপ্ন সে যেন পড়ালেখা শিখে অনেক বড় চাকরি করে। তিনি বলেন, এখন আমার যুদ্ধ দরিদ্রতার বিরুদ্ধে। পুরুষ মানুষ আমাকে নিয়ে কী বলল তা নিয়ে আমি ভাবি না। আমার ভাবনা একমাত্র পরিবার এবং সন্তানদের নিয়ে। তারা ভালো থাকলেই আমার পরিশ্রম সার্থক। সুমি বলেন, এই রিকশা আমাকে জীবিকানির্বাহ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর ঢাকা শহরে একমাত্র নারী রিকশাচালক হিসেবে আমি খুশি।

জেসমিন এবং সুমির চেয়ে লিপিকা অধিকারীর জীবনের গল্পটা একটু ভিন্ন। জেসমিন এবং সুমি যখন স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে পরিবারের খরচ মেটাতে রিকশা চালাচ্ছে তখন চাঁদপুরের লিপিকা শুধু পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য নয় পাশাপাশি স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়নির্বাহ করতেও রিকশা চালানো শুরু করেন।

রতন অধিকারী মতলব উপজেলায় রিকশা চালাতেন। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এলাকা হতে আবর্জনা সংগ্রহের কাজও করতেন তিনি। দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করলেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখীই ছিলেন রতন। কিন্তু ২০১৫ সালে ঢাকা হতে বাড়ি চাঁদপুরে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন রতন। এরপর থেকে শুরু হয় লিপিকার জীবন যুদ্ধ। চিকিৎসার অভাবে স্বামী হয়ে যান পঙ্গু।

পরিবারের সবার মুখে খাবার তুলে দিতে এবং স্বামীর চিকিৎসা খরচ চালাতে ৪৫ বছর বয়সী লিপিকা স্বামীর রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। সেইদিনের পর থেকে প্রতিদিনই রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন লিপিকা। ঝড়, বাদল কিংবা প্রখর রোদ্দুর কিছুই দমাতে পারেনি লিপিকাকে। স্বামীর মত রিকশা চালানোর পাশাপাশি এলাকা হতে ময়লা সংগ্রহের কাজও শুরু করেন লিপিকা।

তিন সন্তানের মা লিপিকার বড় ছেলে একটি ট্রলারে হেল্পার হিসেবে কাজ করে। বাকী দু’সন্তান তার সাথেই থাকে। লিপিকা বলেন, রিকশা চালিয়ে আমার প্রতিদিন গড়ে ৩শ’ টাকা আয় হয়। এছাড়াও ময়লা সংগ্রহের কাজ থেকেও কিছু আয় হয়। এসব থেকে এক হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিই। আর বাকি টাকা সংসার খরচে ব্যয় করি।

২৯/৪/২০১৭/২০/