দীর্ঘসময় ফল সংরক্ষণের কৌশল…

অপূর্ব হাসান, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

আপনি কি কখনো কাঠবিড়ালি দেখেছেন কিভাবে সে তার দিন অতিবাহিত করে? কাঠবিড়ালি সারাদিন তার খাদ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যাস্ত থাকে। কাঠবিড়ালি তাঁর সংগৃহীত বাদাম মাটির নীচে লুকিয়ে রাখে এবং তাঁর প্রয়োজনের সময় ঠিকই সেগুলো খুঁজে পায়। প্রাণিজগতে এমন আরও খাদ্য সংগ্রাহক আছে যেমন- বনবিড়াল তাদের ছোট ছোট শিকার সংরক্ষণ করে, গন্ধমূষিক বা ছুঁচা কেঁচো সংরক্ষণ করে, শিয়াল ডিম সংগ্রহ করে গর্তের মধ্যে রেখে দেয়। এমন কি ইঁদুরও খাদ্য সংগ্রহের বিষয়ে সৃজনশীল। সে তার বাসার মাটির নিচে বীজ সংরক্ষণ করে রাখে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য।

মানুষের জন্য খাদ্য সংরক্ষণ তার জীবনযাত্রার ধরনের উপর নির্ভরশীল। আসলে সৃজনশীলভাবে খাদ্যসংরক্ষণ ও প্রাকৃতিকভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিল। যখন ফ্রিজ ছিল না এবং মুদির দোকান ছিল না তখন মানুষকে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হত। প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও প্রচুর খাদ্য এর যোগান আছে বলে আমাদেরকে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য এত কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ মহামারি, জাতিগত অস্থিরতা ইত্যাদি নানা কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি তে টিকে থাকার জন্য মজুদ করা খাদ্য কাজে লাগতে পারে।

আসুন এবার জেনে নেই সেরকম কিছু পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবারের নাম যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং এদের সংরক্ষণ পদ্ধতিই বা কি?

লাল বা বাদামি চাল: লাল চাল এ থায়ামিন, রিবফ্লাবিন, ভিটামিন বি৬, ফলেট ও নিয়াসিন আছে। এছাড়াও এতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফরাস আছে। ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে অর্থাৎ আর্দ্রতা, তাপ ও পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারলে লাল চাল অনেকদিন পর্যন্ত ভাল থাকে। এর জন্য খাদ্যমান ভাল থাকে যেন সেই রকম একটি পাত্রে চাল রাখতে হবে যার মুখটি ভালোভাবে আটকানো যায় এবং এই পাত্রটি সূর্যের আলো থেকে দূরে ও শুকনো স্থানে রাখতে হবে।

বাদাম ও বীজ: ভিটামিন, খনিজ লবণ, প্রোটিন ও ফাইবার এর চমৎকার উৎস হচ্ছে বাদাম ও বীজ। বিভিন্ন ধরণের বাদাম পাওয়া যায়, যেমন- কাঠ বাদাম, কাজু বাদাম,পেস্তা বাদাম, আখরোট ইত্যাদি। আখরোটে ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড আছে যা হৃদরোগ প্রতিরোধ করে। কুমড়ো বীজে উচ্চমাত্রার ক্যারোটিনয়েড ও অ্যান্টিওক্সিডেন্ট থাকে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এদেরকে ভালোভাবে সংরক্ষণের জন্য ভালোভাবে মুখ বন্ধ করা যায় এমন একটি পাত্র লাগবে এবং ঠান্ডা জায়গায় রাখতে হবে।

মধু: মিশরের একটি সমাধিতে ৩০০০ বছরের পুরনো মধু পাওয়া গিয়েছিল যা তখন ও খাওয়ার উপযুক্ত ছিল। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে এর রঙ ও ঘনত্বের পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু এর কার্যকারিতা ঠিকই থাকবে। মধু শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য নয় এর অফুরন্ত ঔষধি গুণের কথাও আমরা জানি। মধুর ঔষধি গুণ নিয়ে হিপোক্রেটিস ‘লিকুইড গোল্ড’ নামে একটি বই লিখেছেন। তরল মধু শুকনা ও ঠাণ্ডা জায়গায় রাখতে হবে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছে না।

পনির: পনিরে প্রচুর ভিটামিন ও ফ্যাট আছে। ফ্রিজের বাহিরে পনির সংরক্ষণের জন্য একে মোম দিয়ে পুরোপুরি মুড়িয়ে নিতে হবে। এভাবে রাখলে পনির এক বছর ভালো থাকবে।

মটরশুঁটি: মটরশুঁটিতে প্রচুর প্রোটিন ও ফাইবার থাকে। মুখবন্ধ ও ভালোমানের একটি পাত্রের মধ্যে সামান্য ড্রাই আইস দিয়ে শুকানো মটরশুঁটি রাখলে দশ বছর পর্যন্ত ভালো থাকবে। পাত্রটি শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।শিমের বীচি ও এভাবে সংরক্ষণ করা যায়।

চা ও কফি: চা ও কফি মনকে চাঙা করে।অনেক চা এ ক্যান্সার প্রতিরোধি উপাদান আছে এবং রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল কমানোর ক্ষমতা আছে। সাধারণত চা-কফি দুই থেকে পাঁচ বছর এমনিতেই ভালো থাকে। আরো বেশিদিন রাখার জন্য চা এর ব্যাগ গুলো বায়ুশূন্য ব্যাগ বা পাত্রে রেখে ঠাণ্ডা ও অন্ধকার স্থানে রেখে দিতে হবে।

অর্গানিক জারকি: গবাদি পশুর মাংস কে পাতলা করে কেটে শুকানোর পর লবণ দিয়ে রাখা হয় এটাকেই জারকি বলা হয়। বিদেশে প্যাকেটজাত জারকি পাওয়া যায়।আমাদের দেশে কোরবানীর মাংস ভেজে বা রোদে শুকিয়ে রাখা হয় যা অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে। এছাড়াও ইলিশ মাছ লবণ দিয়ে রাখা হয় যেটা নোনা ইলিশ নামে পরিচিত এবং জনপ্রিয়। প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য এই জারকি সংরক্ষণ করতে একে বায়ুশূন্য প্যাকেটে ভরে ঠাণ্ডা ও অন্ধকার জায়গায় রাখতে হবে।

উপরোক্ত গুলো ছাড়াও আরো অনেক খাবার আছে যা অনেকদিন যাবত সংরক্ষণ করে রাখা যায়, যেমন সামুদ্রিক লবণ, শুকনো যব, নারিকেল তেল, ময়দা, আটা, আপেল সিডার ভিনেগার, শুকনা দুধ ইত্যাদি।

১৪/৫/২০১৭/৩১০/