জামাই মানে কি হাসির পাত্র…

মনির/জামান, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

আমি এক জামাই। ফরমাবরদার ও অনুগত। আমার স্ত্রী রওশন আরাকে আমার জীবনের সব বিষয় জানিয়ে রাখা আমার জীবনযাপন পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। দীর্ঘদিন এভাবেই চলছি। আল্লাহ আমার ভালো করুন।
স্ত্রীর সাথে সবকিছু শেয়ার করার কারণে আমার স্ত্রী আমার বন্ধুদের সব অভ্যাস চরিত্র সম্পর্কে অবগত। যার ফলে আমার বন্ধুরা আমার কাছে যত প্রিয়, রওশন আরার কাছে তত অপ্রিয়। বন্ধুদের যেসব অভ্যাস চরিত্র আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে, সেসব গুণ ভদ্রলোকদের মাঝে থাকা অপমানকর বলে মনে করে আমার স্ত্রী।
আরে, আবার মনে করবেন না আমার বন্ধুরা এমন পর্যায়ের যে, তাদেরকে আমি কোনো সম্ভ্রান্ত অনুষ্ঠানে হাজির করতে পারবো না। তারা তাদের জ্ঞান-প্রজ্ঞার কারণে, তাদের পজিশনের কারণে, সেই সাথে আমার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কারণে বলতে পারি সবাই অভিজাত ব্যক্তি।
আমি কী করবো, তাদের বন্ধুত্বের কারণে আমার ঘরের শান্তি এতো বেশি বিঘ্নিত হয়, যা বলে বুঝানো যাবে না। না সইতে পারি, না কইতে পারি। এবার কয়েকটা উদাহরণ দিই।
আমার বন্ধু মীর্জা সাহেব প্রসঙ্গে আলোচনা করা যায়। ভালো, বিশিষ্ট ব্যক্তি। বন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। তার চেহারা এতো পুতপবিত্র যে, তাকে মসজিদের ইমাম মনে হয়। তিনি জুয়া খেলেন না। ডাণ্ডাগুলি খেলার আগ্রহ তার নেই। পকেটমার হিসেবে কখনই তাকে আটক করা হয়নি। তবে তিনি কবুতর পালেন। এগুলোতে মানসিক শান্তি পান।
আমার স্ত্রীর অবস্থা হলো- কোনো বদমাইশ যদি জুয়া খেলে গ্রেফতার হয়, তাহলে সেই ছেলের মায়ের কাছে গিয়ে মাতম শুরু করে দেয়। কেউ ডাংগুটি খেলে চোখে ব্যথ্যা পেলে তার চিকিৎসায় এগিয়ে যায়। পট্টি বেঁধে দেয়। কোনো পকেটমার ধরা পড়লে তার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে ঘন্টার পর ঘণ্টা অশ্রু বহাতে থাকে।
কিন্তু সেই বুজর্গ ব্যক্তি- যাকে দুনিয়ার সবাই মীর্জা সাহেব মীর্জা সাহেব বলে সম্বোধন করে ক্লান্ত। তাকে আমার বাড়িতে ‘কমবখত কবুতরবাজ’ নামেই আলোচনা করা হয়। যদি কখনও ভুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিল, কাক, চিলের মতো কিংবা বাজের মত শিকারী পাখি দেখতে থাকি, তখন রওশন আরা মনে করতে থাকে- এবার উনিও গেলেন! এই বুঝি উনি কবুতরবাজ হয়ে উঠলেন! এরপর মীর্জা সাহেবের শানে কসীদা পাঠ শুরু হয়ে যায়। মাঝে আমার শানেও পঙক্তি থাকে, কখনও দীর্ঘ বহরে, কখনও ছোট বহরে।
একদিন যখন এমন অবস্থা শুরু হলো তখন আমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম কমবখত মীর্জাকে কখনই আমার কাছে ঘেঁষতে দেব না। আরে, আগে তো ঘর সামলাতে হবে! স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসার সামনে বন্ধুদের সন্তুষ্টির কি কোনো মূল্য আছে? তাই সেদিন রাগান্বিত হয়ে মীর্জা সাহেবের বাড়িতে গেলাম। দরজায় কড়া নাড়ানোর পর বলল, ভেতরে এসো। আমি বললাম, না, আসতে পারবো না। তুমি বাইরে এসো। শেষ পর্যন্ত আমি ভেতরে গেলাম। শরীরে তেল মালিশ করে একটি কবুতরের ঠোঁট মুখে লাগিয়ে রোদে বসে ছিল। বলল, বসে যাও। আমি বললাম, বসবো না। শেষমেশ আমি বসে গেলাম।
– মনে হচ্ছে মেজাজ খারাপ। মীর্জা বললেন।
– কী ভাই? ভালো তো? আমি বললাম।
কিছুই বলতে পারলাম না। কেন এখানে এলাম? কিছুক্ষণ বসে থাকার পর এবার মাথা খুলতে লাগলো, মনে মনে পরিকল্পনা করা শুরু করলাম। প্রথমে ইচ্ছা হলো- একদমে সব বলে ফেলবো আর রাগের ভাব নিয়েই চলে যাবো। তারপর মনে হলো এভাবে চলে গেলে মনে করবে ইয়ার্কি মারছি। এজন্য ভাবলাম সিরিয়াস ভাব নিয়েই বলব।
শেষ পর্যন্ত মুখ থেকে কথা বের হলো। বললাম, মীর্জা ভাই! কবুতরের অনেক দাম বেড়ে গেছে? একথা শুনেই মীর্জা সাহেব চীন থেকে শুরু করে আমেরিকার কবুতরের পরিসংখ্যান দেওয়া শুরু করল। তারপর শুরু হলো খাদ্যের উচ্চমূল্যের প্রসঙ্গ। তা থেকে চলে গেল বাজারের জিনিসপত্রের দাম বেশির দিকে। এতো দূরে প্রসঙ্গ চলে গেল যে, আমার নিজের কথা আর বলতে পারলাম না। সেদিন এভাবেই ফিরে এলাম। তবে সম্পর্ক কাটাকাটি করার ইচ্ছা মনের মাঝে রয়েই গেল।
আল্লাহর ইচ্ছায় বিকালে বাড়িতে মিটমাট হয়ে গেল। আমি বললাম, মীর্জার সাথে বিরোধ রেখে আর কী লাভ? তাই পরের দিন মীর্জার সাথে মিলমিশ হয়ে গেল। কিন্তু আমার জীবনকে তিক্ত করে তুলতে কোনো না কোনো বন্ধু আছেই। আমার মনে হয় আল্লাহ আমার মাঝে মেনে নেওয়া ও সন্ধি করে ফেলার গুণ স্বভাবজাত করে দিয়েছেন। এটা করতেই হয়। কারণ আমার বন্ধুদের খারাপ অভ্যাসগুলো আমার বৌয়ের নজরে খুব দ্রুত ধরা পড়ে। এমনকি আমার নিজস্ব গুণগুলোও বন্ধুদের পাল্লায় উধাও হয়ে যায়।
বিয়ের আগে হঠাৎ দশটায় উঠতাম। সাধারণত ওঠা হতো এগারটায়। এখন কয়টায় উঠি? এর জবাব সেই ভালো দিতে পারবে, যার বাসায় সকাল সাতটায় নাস্তা করা বাধ্যতামূলক। যদি আমি কখনও শারীরিক দুর্বলতার কারণে মোরগের মতো ভোরে উঠতে টালবাহানা করি, তখনই বলা শুরু হয়ে যায়- বদমাইশদের সংশ্রবের ফল এটি।
একদিন ভোরে গোসল করছি। শীতকাল ছিল। ঠাণ্ডায় হাত-পা কাঁপছিল। মাথায় সাবান মাখছিলাম। নাকে তা মলতে ছিলাম। খোদা জানে, কোন ভাবের জগতে চলে গেলাম। গুণ গুণ করে গাইতে লাগলাম। একপর্যায়ে জোরে গান গাইতে লাগলাম ‘তুরি ছলবল হে নিয়ারী ….
এটাও আমার অত্যন্ত কুরুচির প্রকাশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো। আর এর পেছনে কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হলো আমার বন্ধু পণ্ডিতজীকে। সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যার প্রেক্ষিতে সব বন্ধুকে ছেড়ে দেয়ার কসম করেছি।

তিন-চার দিন আগের ঘটনা। সকালে রওশান আরা আমার কাছে এসে তার বাপের বাড়ি যাবার অনুমতি চাইলো। আমার সাথে বিয়ে হবার পর রওশন আরা মাত্র দুবার বাপের বাড়ি গিয়েছে। সে এতো সরলতা আর বিনয়ের সাথে বলল, আমি আর না করতে পারলাম না।
তাহলে কি দেড়টার গাড়িতে চলে যাব? রওশন আরা বলল ।
তাহলে আর কী? আমি জবাবে বললাম।
সে দ্রুত তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আর আমার মাথায় স্বাধীনতার ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগল। মানে, এবার বন্ধুরা বাসায় আসতে পারবে। নিশ্চয়ই খুব হই-চই হবে। আমি যখন ইচ্ছা তখন খাব, যখন খুশি তখন ঘুম থেকে উঠতে পারব। থিয়েটার দেখতে যেতে পারব। আমিই রওশন আরাকে বললাম, তাড়াতাড়ি কর, অন্যথা গাড়ি ফেল করবে।
রওশনের সাথে স্টেশনে গেলাম। গাড়িতে ওঠার পর সে বলল, নিয়মিত চিঠি পাঠাবেন।
আমিও বললাম, প্রতিদিন তুমিও পাঠাবে।
: সময়মতো খাবার খাবেন। ধোলাই করা জামা রুমাল আলমারির নীচের পার্টে আছে।
এরপর কিছুক্ষণ আমরা চুপচাপ থাকলাম। পরস্পরের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকলাম। তার চোখে অশ্রু চলে এলো। আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। যখন গাড়ি ছেড়ে চলে গেল, অনেকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
আস্তে আস্তে পা বাড়ালাম। বইয়ের দোকানে এলাম। ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে লাগলাম। ম্যাগাজিনের ছবি দেখলাম। একটা পত্রিকা কিনে ভাঁজ করে পকেটে নিলাম। অভ্যাস অনুযায়ী বাড়ির পথ ধরলাম। হঠাৎ মনে এলো, এখন বাড়ি ফেরা জরুরি না। এখন যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারি। ইচ্ছা করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে পায়চারি করতে পারি। মনে চাইল কিছু খাওয়ার।

প্রচলিত আছে, যদি আফ্রিকার নিগ্রোদেরকে কোনো সভ্য দেশে কিছু দিন রাখা হয়, তাহলে তারা সেখানকার সভ্যতা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু যখনই তারা জঙ্গলে ফিরে আসে, তখন খুশির চোটে চিৎকার শুরু করে। ঠিক এমন অবস্থাই আমার মনের মাঝে বয়ে যাচ্ছে। স্টেশন থেকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বের হলাম। মুক্ত স্বাধীন স্টাইলে টাঙ্গা-গাড়িওয়ালাকে ডাক দিলাম। লাফিয়ে টাঙ্গায় উঠলাম।
সিগারেট ধরালাম। সিটের উপর পা ছড়িয়ে দিলাম। ক্লাবের দিকেই রওয়ানা হলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর একটি জরুরি কাজের কথা মনে পড়ল। টাঙ্গা ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। বাড়ির বাইরে থেকেই চাকরকে ডাকলাম।
: আমজাদ
: হুজুর
: যাও, নাপিতকে গিয়ে বলে এসো সে যেন আগামীকাল এগারটায় আসে।
: ঠিক আছে।
: এগারটায় শুনেছো তো? আবার অন্যদিনের মতো ছয়টায় যেন চলে না আসে।
: বহুত আচ্ছা হুজুর।
: যদি এগারটার আগে আসে, তাহলে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে।

সেখান থেকে ক্লাবে পৌঁছালাম। আজ পর্যন্ত কোনোদিন বেলা দুইটায় ক্লাবে যাইনি। ভেতরে প্রবেশ করে দেখি, নিস্তব্ধ। কোনো মানুষের দেখা নাই। সব কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সবই খালি। রাডকক্ষ, শতরঞ্জ কক্ষ খালি। তাস খেলার ঘরও খালি। শুধু খাবার ঘরে এক কর্মচারী ছুরি ধার করছে।
তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আজ কেউ আসেনি? সে বলল, হুজুর আপনিই তো ভালো জানেন। এ সময় আর কেউ আসে?
অনেক নিরাশ হলাম। বাইরে বের হয়ে ভাবতে লাগলাম, এখন তাহলে কী করা যায়? আর কিছু না ভেবে সেখান থেকে সোজা মীর্জা সাহেবের বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়ি থেকে জানালো, এখনও অফিস থেকে ফেরেননি। তাই অফিসে পৌঁছালাম। আমাকে এ সময় দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। আমি সব খুলে বললাম। বললেন, বাইরের কক্ষে বসো। অল্প কাজ বাকি আছে। হাতের কাজটা শেষ করেই তোমার সাথে পালাব। বিকালে কী প্রোগ্রাম?
আমি বললাম, থিয়েটার।
বলল, ঠিক আছে, তুমি বাইরে বসো, আমি এখনই আসছি।
বাইরের রুমে একটা ছোট চেয়ার ছিল, তাতে বসেই অপেক্ষা করতে লাগলাম। পকেট থেকে পেপার বের করলাম। পড়া শুরু করলাম। পত্রিকার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়া হয়ে গেল। এখনও চারটা বাজতে এক ঘণ্টা বাকি। পত্রিকা আবার শুরু থেকে পড়া শুরু করলাম। খবর পড়া শেষ করে, সব বিজ্ঞাপন পড়াও শেষ।
বিজ্ঞাপনগুলো দ্বিতীয়বার দেখলাম। এবার পত্রিকা ছুড়ে মেরে কোনো লৌকিকতা না করেই হাই তুলতে লাগলাম। হাইয়ের পর হাই আসছিল। এতো হাই তুলছিলাম যে, চাপায় ব্যথা শুরু হয়ে গেল। এবার পা নাড়াতে লাগলাম। আর কত পা দোলানো যায়? এরপর টেবিলে তবলা বাজাতে লাগলাম। আমি অনেক ক্লান্ত। এবার মীর্জার রুমের দরজা খুলে মীর্জাকে বললাম, আরে দোস্ত! আমার সাথে যাবি? নাকি অপেক্ষায় রেখে মেরে ফেলবি। বেটা! আমার সারাদিন শেষ করে দিলি।
সেখান থেকে বেরিয়ে মীর্জা সাহেবের বাড়ি গেলাম। বিকালটা অনেক মজা করে কাটলো। খাবার ক্লাবে খেলাম। সেখান থেকে আরও বন্ধুদের নিয়ে থিয়েটার দেখতে গেলাম। রাত আড়াইটায় বাসায় ফিরলাম।
বালিশে মাথা রাখতেই ঘুম চলে এলো। সকালে যখন চোখ খুললাম তখন সূর্যের আলো ঘরে খেলা করছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পৌনে এগারটা বাজে।
হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে একটি সিগারেট ধরালাম। তা তশতরীতে রেখে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
এগারটায় আমজাদ ঘরে এলো। বলল, হুজুর! নাপিত এসেছে।
আমি বললাম, এখানে ডেকে নিয়ে এসো। এ আরাম অনেক দিন পর ভাগ্যে জুটলো। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নাপিতের কাজ শেষ করে দেব। খুব ধীরে সুস্থে সব শেষ করে উঠলাম। গোসল করে বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। এবার দেখি মনে সেই আনন্দ নেই, যার অপেক্ষায় ছিলাম। বের হবার সময় আলমারি থেকে রুমাল বের করলাম। আল্লাহ জানে কোথা থেকে কী ভাবনা মনে উঁকি দিলো আর আমি সেখানেই চেয়ারে বসে গেলাম। সদাই এর মতো রুমালের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আলমারির আরেক পার্ট খুললাম। সুরমা রঙের একটি রেশমি ওড়না নজরে পড়ল। বের করলাম তা। হালকা হালকা আতরের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। অনেকক্ষণ এটায় হাত বুলাতে থাকলাম। মনটা ভালো হয়ে গেল। বাড়িটি সোনায় ভরে গেল। একধরনের আবেগ আমাকে ছেয়ে নিল। নিজেকে সামলে নিলাম। তবে অশ্রুফোটা গড়িয়ে পড়ল। অশ্রু ঝরায় আমি অস্থির হয়ে পড়লাম।
সত্যি সত্যি কান্না শুরু করে দিলাম। তার সবগুলো জামা বের করে পর্যায়ক্রমে দেখতে লাগলাম। জানি না, এতে আরো কত কী মনে পড়তে লাগলো। আমি অস্থির হয়ে পড়লাম। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বাইরে বের হলাম। সোজা টেলিগ্রাম অফিসে হাজির হলাম। অফিস থেকে টেলিগ্রাম পাঠালাম- ‘আমি অনেক উদাস। তুমি এখনই চলে এসো।’
টেলিগ্রাম পাঠানোর পর মন কিছুটা হালকা হলো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রওশন আরা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি চলে আসবে। এতে আশান্বিত হলাম। বুক থেকে একটা বোঝা যেন সরে গেল।
দ্বিতীয় দিন মীর্জার বাড়িতে তাসখেলার আড্ডা চলছিল। আমি সেখানে পৌঁছার পর জানতে পারি, মীর্জার বাপের বাড়ি থেকে কিছু লোক এসেছে। তাই সিদ্ধান্ত হলো এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আড্ডা দিতে হবে। আমার বাড়িতো খালিই ছিল। সব বন্ধু সেখানেই উপস্থিত হলো। আমজাদকে জানিয়ে দিলাম, হুক্কা সাপ্লাইয়ে যদি সামান্যও এদিক সেদিক হয়, তাহলে তোমার খবর আছে। পান বারবার পাঠাতে থাকবে যেন সবার তাক লেগে যায়।

এরপরের ঘটনাগুলো কিছু লোকেই ভালো বুঝবে। শুরুতে তাস খেলা নিয়মমাফিক হচ্ছিল। খেলা হলো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে। নিয়ম-কানুন ঠিক রেখে। ভদ্রতা ও বিনয়ের সাথে। দুয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার পর ফাজলামি শুরু হলো। বন্ধুরা একজন আরেকজনের পাতা দেখা শুরু করল। কেউ তার চোখ নিয়ন্ত্রণ করতো না। দুয়েকটা পাতা ফেলার পরই অট্টহাসি শুরু হতো। তিন ঘণ্টা পর এমন হলো কেউ হাঁটু নাড়িয়ে গান গাচ্ছে। কেউ ফরশের উপর পাখির আওয়াজে শিস দিচ্ছে। কেউ নাটকের দুয়েকটা মজার সংলাপ লক্ষ বার আওড়াচ্ছে। তাস খেলা চলছেই। এক পর্যায়ে হই-চই, চিৎকার চেচামেচি শুরু হলো। যখন আমরা খুব মজে আছি, তখন একজন একটা খেলার প্রস্তাব দিল, যা ছোট বেলায় আমরা বন্ধুরা খেলতাম। চোর-পুলিশ খেলা। যে খেলায় একজন বাদশা হয়, আরেকজন মন্ত্রী। তৃতীয়জন হয় দারোগা, আর যে হেরে যায় সে হয় চোর। সবাই বলল, মজার প্ল্যান। একজন বলল, আজ যে চোর হবে তার বারোটা বাজবে। মজা না করলে কী আর হলো, আরে এটা তো বাদশা বাদশাদের খেলা না।

খেলা শুরু হলো। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি হলাম চোর। নানা রকম সাজা প্রস্তাব হতে লাগল। কেউ বলল, খালি পায়ে দৌড়ে পালাবে, মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আনবে। আরেকজন বলল, জি না হুজুর। তার শাস্তি হবে, সবার পায়ে পড়া। সবাই তাকে দুটি করে লাথি মারবে। আরেকজন বলল, আরে না, সে আজ আমাদের সামনে একপায়ে দাঁড়িয়ে নাচবে। এসব প্রস্তাব শুনে বাদশা সালামত বললেন, আমি আদেশ দিচ্ছি, চোরকে কাগজের লম্বা টুপি পরানো হোক। তার চেহারায় কালি মেখে দেয়া হোক আর এ অবস্থায় অন্দর মহলে গিয়ে হুক্কার চিলম ভরে নিয়ে আসবে।

সবাই বলল, বাদশা নামদারের আইডিয়া কত ভালো! কী চমৎকার শাস্তি ঠিক করা হয়েছে। বাহ বাহ আমরাও মজা পাচ্ছি!
আমি বললাম, এতো মজার কী আছে? আজ আমি চোর হয়েছি, কাল তো তোমাদের কারো চোর হতে হবে। সানন্দে নিজেকে শাস্তি নেয়ার জন্য উপস্থিত করলাম। হাসতে হাসতে হাস্যকর টুপি পরলাম। আরে কিছুই হয়নি, এমন ভাব নিলাম। ভেতরের দিকের দরজা খুলে রান্নাঘরে গেলাম। আমি যখন বের হচ্ছি তখন সবাই অট্টহাসি দিয়ে উঠলো। যখন উঠানে পৌঁছেছি, ঠিক তখনই মেইন গেট খুলে একজন বোরকা পরিহিতা নারী ভেতরে প্রবেশ করলো। মুখের নেকাব যখন সরিয়ে দিল, তখন দেখি রওশন আরা!
আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা। শরীর কাঁপা শুরু হলো। নির্বাক হয়ে গেলাম। আমার সামনে সেই রওশন আরা- যাকে আমি টেলিগ্রাম করে জানিয়েছিলাম তুমি এখনই চলে এসো। আমি অনেক উদাস। আর এখন আমার এই অবস্থা যে, মুখে কালি মাখা আর হাতে চিলম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

আমার এ অবস্থা দেখে বৈঠকখানা থেকে বন্ধুরা আরো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। হৃদপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সমস্ত ইন্দ্রীয় স্তব্ধ হয়ে গেছে। রওশন আরা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল। তারপর কথা শুরু করল। কিন্তু আমি কীভাবে বলব, সে কী বলেছে! তার কথা তো আমার কান পর্যন্ত পৌঁছেনি। আমি তো তখন অচেতন অবস্থার মতো ছিলাম।
এতদিন যাবৎ আপনারা জানেন, আমি একজন ভদ্র মানুষ। সত্যি আমি একজন ভদ্রলোক; যখন আমি আমার মতো চলি। আমার চেয়ে ভালো জামাই পৃথিবীতে আর নেই। আমার শ্বশুরবাড়িতে সবাই ভালো জামাই হিসেবে জানে। আমার বিশ্বাসও আমি ভালো। কিন্তু এই বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আজ লজ্জিত। তাই আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করছি, আমি ঘরে থাকব, না হয় বাইরে কাজে যাব। আমি আর কারো সাথে মিশব না। কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে যাব না, কাউকে আমার বাড়িতে আসতেও দেব না। শুধু ডাকপিয়ন আর নাপিত বাড়িতে আসতে পারবে। তাদের সাথে সংক্ষেপে কথা সেরে নেব।

– চিঠি এসেছে?
– জী, হ্যাঁ।
– দিয়ে যাও, চলে যাও।
নাপিতকে বলব-
নখ কেটে দাও
যাও, চলে যাও।
এর চেয়ে বেশি কথা আর কারও সাথে বলব না। আপনারা ঠিকই দেখে নেবেন।

১৫/৪/২০১৭/১৮০