চালের বাজার যেন আগুন কয়লা…

মনির জামান ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

রাজধানীসহ সারাদেশে দফায় দফায় বেড়ে চলছে চালের দাম। দীর্ঘদিন চালের বাজার স্থিতিশীল থাকার পর হুট করেই প্রতি কেজি চালে চার থেকে ছয় টাকা করে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও পাইকারি পর্যায়ে আবারো বেড়েছে চালের দাম। চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও গত আট মাসের মধ্যে প্রতি মাসে কয়েক দফা বেড়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই নাজিরশাইল, মিনিকেট, আটাশসহ সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে তিন টাকা পর্যন্ত।
দাম বাড়ার কারণ হিসেবে খুচরা বিক্রেতারা ব্যবসায়ীদের কারসাজিকেই দূষছেন। তারা বলেন, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট চাল মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। মিলার পাইকাররা এ সংকট সৃষ্টি করে অতিমাত্রায় মুনাফা লুটে নেয়ার চেষ্টা করছেন।
গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি চালের দাম নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান-চালের মজুদ রয়েছে। তারা কথা দিয়েছেন বৈশাখে নতুন ধান ওঠার আগে আর চালের দাম বাড়াবেন না। বরং নতুন ধান উঠলে চালের দাম আবার স্বাভাবিক হবে। জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, কাপ্তান বাজার, মোহাম্মদপুর বাজার, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট বাজার, হাতিরপুল বাজারসহ কয়েকটি বাজারে গিয়ে ও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে স্বর্ণা, মিনিকেট, বিরি-২৮, পারিজাতসহ প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা করে বেড়েছে। আর মোটা চালের দাম ৮-১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে ৩৮-৪০ টাকা দরে স্বর্ণা, ৪০-৪২ টাকা দরে বিরি ২৮, ৫০-৫৫ টাকা দরে মিনিকেট, ৩৮-৩৯ টাকায় পারিজাত, ৫৩-৫৬ টাকায় নাজিরশাইল, ৫৪-৫৮ টাকায় বাসমতী, ৭০-৭৫ টাকায় কাটারিভোগ এবং ৮৫-৯০ টাকা কেজিতে পোলাও’র চাল বিক্রি হচ্ছে।
এর মধ্যে মোটা গুটি চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। কেজিতে ১০-১২ টাকা বেড়ে এ চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৮-৪০ টাকা দরে। রাজধানীর পাইকারি চালের বাজার বাবুবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের চালই কেজিতে ৩ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বিক্রেতারা দাম বাড়ার জন্য দূষছেন চাতাল ও মিল মালিকদের।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল দুই সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের অত্যাবশ্যক এই চাল কেজিতে বেড়েছে ৮ টাকা পর্যন্ত। কারওয়ান বাজারের লাকসাম জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ থেকে অস্বাভাবিকভাবে সব চালের দামই বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম।
গুটি স্বর্ণাখ্যাত মোটা চাল কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত কয়েক বছরে এ চালের দাম এতটা বেড়েছে বলে জানা নেই। তিনি বলেন, বাজারে মোটা চাল একেবারেই নেই। যাও বিক্রি হচ্ছে তা বেশি দামে। ফলে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষরা এই চাল না পেয়ে বেশি দামে অন্য চাল কিনছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইরি-বোরো মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় চলতে থাকায় বাজারে ধানের সরবরাহ কম। এই সুযোগ নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেট। তারা চাল ধরে রাখায় দাম বাড়ছে। এ ছাড়া মিলার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করছেন অতিমাত্রায় মুনাফার। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও তারা চাল নিয়ে কারসাজি করছেন। তারা ইচ্ছামতো চালের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন।
বাহাদুর বাজারে চাল কিনতে আসা শহিদা খাতুন বলেন, ৬/৭ দিন আগেও চাল কিনেছি প্রতি কেজি ৩০/৩২ টাকায়। কিন্তু আজ সেই চালই ৩৬ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম এভাবে বাড়ায় আমরা পড়েছি মহা ফ্যাসাদে।
খুরচা চাল বিক্রেতা সোহেল রানা বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম বস্তায় (৫০ কেজি) বেড়েছে ১শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত। মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চাল মজুদ করছে। তারা যে দামে বাজারে চাল ছাড়ছে আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে তার চেয়েও বেশি দামে। তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অস্বীকার করে জেলা চাল কল মালিক সমিতির সদস্য নুরুজ্জামান সরকার বলেন, বর্তমানে জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। নতুন ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। মিল মালিকদের বিরুদ্ধে মজুদের অভিযোগ সত্য নয়।
এদিকে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক দশকে পাঁচ ধরনের চালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব ধরনের চালের দাম ১০ বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে। ক্যাবের ঐ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মিনিকেট চালের দাম ২০০৬ সালে ছিল প্রতি কেজি ২৭ দশমিক ৯৫ টাকা। ২০১৬ সালে ঐ চালের দাম হয় ৪৮ দশমিক ৩৪ টাকা। ২০০৬ সালে নাজিরশাইলের দাম ছিল ২৫ দশমিক ৫৪ টাকা। ২০১৬ সালে ঐ চালের দাম হয় ৫৫ দশমিক ৭৮ টাকা। ২০০৬ সালে পাইজাম চালের দাম ছিল ২৩ টাকা। ২০১৬ সালে ঐ চালের দাম দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ৩৭ টাকা। ২০০৬ সালে পারিজা/স্বর্ণার দাম ছিল ১৯ দশমিক ২৫ টাকা। গত বছর ঐ চালের দাম ছিল ৩৭ দশমিক ১৯ টাকা। ২০০৬ সালে বিআর ১১/৮ এর দাম ছিল ১৮ দশমিক ২৫ টাকা। গত বছর ঐ চালের দাম দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৪১ টাকা।

১১/৪/২০১৭/২০/ম/জা/