ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না দুই লক্ষাধিক মানুষ…

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

ধেয়ে আসা প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চরবাসীদের অনেকে ফোনে ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানালেও চরবাসীদের অনেকেই তা বিশ্বাস করছেন না। তারা বলছেন, আকাশে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এছাড়া বড় ধরনের বিপদ সংকেত দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্তত মাইকিং করে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হতো বলেও জানান তারা।

জানতে চাইলে হাতিয়া দ্বীপের ঢালচরের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বাংলারিপোর্টকে বলেন, ‘কিসের ঘূর্ণিঝড়! আমার তো মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। এছাড়া এখন নেটওয়ার্কও থাকে না। আমরা তো জানি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো বার্তা দেয়া হয়নি। এখন কি করব? কোথায় থাকব? আমাদের এ চরে তো কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রও নেই।’

প্রায় ছোট-বড় ২০টি চর নিয়ে হাতিয়া দ্বীপ গঠিত। এসব চরের মধ্যে অন্তত ১৫টি চরে মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে পাঁচটি চর মোটামুটি উন্নত। বাকি ১০টি চরে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। যে কারণে কোনো দুর্যোগময় মুহূর্তে এসব চরের মানুষ কোনো সতর্কবার্তা পান না।

বিভিন্ন সময়ে উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে এ চরগুলোতে প্রাণহাণির ঘটনা বেশি ঘটে।

জানতে চাইলে দ্বীপের নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. শাহেদ উদ্দিন বাংলারিপোর্টকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে ঘূর্ণিঝড় হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিকেল থেকে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি নেই।’

তিনি জানান, নিঝুমদ্বীপের মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানলেও আশপাশের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষ তা জানেন না। এসব চরে মানুষের পাশপাশি লাখ লাখ গরু-মহিষও রয়েছে।

হাতিয়া দ্বীপের চরগুলো মধ্যে বয়ারচর, নলেরচর, ক্যারিংচর, হাজাজ্জার চর (স্বর্ণদ্বীপ), জাগলার চর, ঢালচর, দমারচর, মৌলভীরচর, কেলাতলিরচর, চরঘাসিয়া, চরগজারিয়া অন্যতম। এর মধ্যে বয়ারচর, নলেরচর, ক্যারিংচর, হাজাজ্জার চরের (স্বর্ণদ্বীপ) মানুষ মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের মধ্যেমে দুযোগ বার্তা জানতে পারলেও বাকি চরগুলোতে কোনো খবর পৌঁছায়নি। ওই চরগুলো মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। নেই কোনো রাস্তাঘাট কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র। আর অবহেলিত এ চরগুলোতে অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন।

ক্যারিংচরের বাসিন্দা ফোনে বাংলারিপোর্টকে বলেন, ‘সিকনাল (সংকেত) আছে হুইনছি (শুনেছি)। মোবাইলে ঢাকাত্তোন (ঢাকা থেকে) কইছে। কিন্তু আঙ্গো (আমাদের) ইয়ানে (এখানে) কোনো মাইকিং-টাইকিং নাই। আগে তো বন্য অইলে (হলে) হতাকা (পতাকা) উড়তো। অন হেগিও (এখন সেগুলোও) দেখি না। আল্লার ওপর ভরসা করি আছি। যা অয় অইব।’

দ্বীপে বাংলারিপোর্টে সংবাদকর্মীরা জানান, হাতিয়ার কোনো এলাকায় এখনও মাইকিং করা হয়নি। খোলা নেই আশ্রয় কেন্দ্রগুলোও। চালু করা হয়নি দুর্যোগ উপলক্ষে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদারকিও নেই। স্থানীয়রা নিজেদের প্রয়োজনেই নিজেরা উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ অবস্থায় কোনো দুর্যোগ হলে অতীতের মতো ভয়াবহ মাশুল দিতে হবে হাতিয়াবাসীকে।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মো. রেজাউল করিম বাংলারিপোর্টকে বলেন, ‘এখনও দুর্যোগ শুরু হয়নি। আসবে শুনছি। অপেক্ষায় আছি, আসুক।’

দুর্যোগ আসলে কী পরিমাণ প্রস্তুতি রয়েছে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষকে বলে দিয়েছি। সাইক্লোন সেন্টারগুলো রেডি রেখেছি। অনেকে গেছেন, অনেকে যাননি। চরগুলোতে মানুষ থাকে না। কিছু মানুষ গেছেন। যারা শখের বসে গেছেন। তারা চলে আসতে পারলে তো পারলো। না পারলে কি করার! বাকি চরের কোনো খবর নেই।’

জানা গেছে, বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে হাতিয়া দ্বীপে ১৬০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই স্কুল-কলেজ কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করে রেখেছে। এখনো কেন্দ্রগুলো খোলা হয়নি। ফলে দুর্যোগ এলে সাধারণ মানুষ এখন আর এসব আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার কথা ভাবেন না।

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০৭ (সাত) নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ১০ (দশ) নম্বর পুনঃ ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ (দশ) নম্বর পুনঃ ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০৫ (পাঁচ) নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৮ (আট) নম্বর পুনঃ ৮ (আট) নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৮ (আট) নম্বর পুনঃ ৮ (আট) নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

৩০-০৫-২০১৭-০০-১০-৩০-আ/হৃৃ/