এপ্রিল 01

খুলনায় অনাবাদী জমির পরিমান দ্বিগুন……

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম  খুলনায় প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হয়ে আসছে ফসলি বা কৃষি pp (6) - Copyজমি। এ জেলায় আবাদী জমির তুলনায় অনাবাদী জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া গত বছর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ৩৪ হাজার ৭ শ’ ৯২ হেক্টর জমিতে কোনো আবাদ বা চাষ হয়নি। আর প্রতি বছর জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পেলেও ফসলি জমির পরিমাণ তো বাড়েনি বরং কমেছে। সরকারি হিসেব মতে, নানা কারণে গত তিন বছরে খুলনা প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। অপরদিকে বছরে প্রায় ১৪ হাজার জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে বেড়ে গেছে খাদ্য চাহিদাও। এ অবস্থায় খুলনায় খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে এমন আশঙ্কা কৃষি বিশেষজ্ঞদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সনের আদম শুমারী অনুযায়ী খুলনার মোট জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৩২ হাজার ৪ শ’৩৮ জন। এর মধ্যে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫ শ’ ২৫ জন। প্রতিটি কৃষক পরিবারের ৪ থেকে ৫ জন সদস্য রয়েছে। সেই হিসেবে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি কৃষক পরিবারের সাথে জড়িত। যার ফলে বাংলাদেশকে কৃষি নির্ভর দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তবে খুলনা জেলা এখনও খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। এর অন্যতম কারণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা, সেই সাথে খাদ্য চাহিদাও। যদিও কৃষি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বরং প্রতিনিয়ত জমি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। খুলনায় প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা বা ইমারত গড়ে উঠছে। এ কাজে ব্যবহৃত অধিকাংশ জমি কৃষি বা ফসলি জমি। এসব জমিতে কোথাও বছরে ২ বার আবার কোথাও বছরে ৩ বার ফসল উৎপাদন হয়। এর পরও জমির মালিকদেরকে এক প্রকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জমি ছাড়তে হচ্ছে। অপরদিকে, ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের আবাসনের জন্য গড়ে উঠছে নতুন নতুন বাড়ি। এসব ইমারত বা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ি-ঘরের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি বা কৃষি জমি। সরকারি হিসেব মতে প্রতি বছর শতকরা ২% হারে ফসলি জমিতে ইমারত গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে বেসরকারি হিসেবে এর পরিমাণ শতকরা ৬%।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০০৮/৯ অর্থ বছরে জেলায় আবাদযোগ্য বা ফসলি জমির পরিমাণ ছিলো ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩ শ’ ৫৮ হেক্টর। ২০১২/১৩ অর্থ বছরে এসে এই জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫ শ’ ৪৭ হেক্টর। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে ৩৪ হাজার ৭ শ’ ৯২ হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। এর পুরোটাই ব্যবহার হয়েছে ইমারত বা বাড়ি-ঘর নির্মাণ কাজে। এভাবে প্রতিবছর কমে আসছে ফসলি জমির পরিমাণ। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর সূত্র মতে, গত বছরের হিসেবে জেলায় মোট আবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭ শ’ ৬৪ হেক্টর। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ৭ শ’ ৯২ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি আবাদ করা হয়নি। এছাড়া জেলায় অনাবাদী জমির পরিমাণ ২ লাখ ৬১ হাজার ২ শ’ ১১ হেক্টর।

সূত্র জানায়, জনসংখ্যা হারে গত বছর খুলনায় খাদ্য চাহিদা (চাল ও গম) ছিলো ৪ লাখ ৬২ হাজার ৬শ’ ১৩ মেট্রিক টন। আর খাদ্য শস্য উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছর খুলনায় খাদ্য ঘাটতি ছিলো ১২ হাজার ৫ শ’ ৭৭ মেট্রিক টন। এ দিকে বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার ৯ শ’ ১১ জন (২০১১ সনের সেনসাস অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির শতকরা ০.৬০ )।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতিদিন দেশে গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্পকারখানা স্থাপন, নগরায়ণ, বসতবাড়ি তৈরি ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজে। এর ফলে দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দেশের কৃষিখাত। এসআরডিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভাগ ওয়ারি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা : চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অন্য বিভাগের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে।

২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০। ১৯৯৬-২০০৮ সময়ে তিন লাখ ৫২ হাজার একর থেকে বেড়ে ছয় লাখ ৭৭ হাজার একরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্ব উন্নয়নসূচক ২০০৯’ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত। ২০০৭ সালে তা’ বেড়ে হয় ২৭ শতাংশ। বৃদ্ধির এ হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সালে আবাদযোগ্য জমি ছিল ৮১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর। ২০০০ সালে তা’ কমে ৭১ লাখ ৯ হাজার হেক্টরে আসে। ২০০৩ সালে ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টরে এসে দাঁড়ায়। গড়ে প্রতিবছর ৪০ হাজার একর আবাদি জমি হারাচ্ছে। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ সরকারি খাসজমির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৭২-২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৬ একর জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। এ খাতে চলে যাওয়া জমির মধ্যে ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে ৬৪ হাজার ৪৮৯ একর জমিতে। দোকান নির্মাণ হয়েছে ৬ হাজার ২৬২ একর জমিতে। কলকারখানা নির্মাণ হয়েছে ২২২ একর জমিতে। বিদ্যালয় দুই হাজার ৮২৭ একর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ৪৯৯ একর ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে এক হাজার ৯৯৯ একর জমিতে। সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সমপ্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। সব গবেষণার ফলাফল প্রায় একই কথা বলছে, কমছে কৃষি জমি। কিন্তু সে জন্য নেই সরকারের কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ। নেই আধুনিক বাস্তবসম্মত কোনো আইন।

বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের সামগ্রীক অর্থনীতির জন্য শিল্পায়ন প্রয়াজন তবে ফসলি জমি নষ্ট করে নয়। জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন, আবাসন এবং কৃষিয়ায়নের দিকে নজর দিতে হবে। এ দিকে ফসলি জমির পরিমাণ কমে আসলেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। সেই সাথে বাড়ছে খাদ্য চাহিদাও। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে ফসল উৎপাদনের জমি এভাবে কমতে থাকলে খাদ্য পরিস্থিতি এক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

১/৪/২০১৭/৫০/সা/ফা/