কৃষক বাঁচাও আন্দোলনে রাস্তায় নেমে পড়েছেন কৃষকরা…

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

সুনামগঞ্জ জেলায় তলিয়ে গেছে দেড় লাখ হেক্টর জমির কাঁচা ধান। যার আনুমানিক মূল্য ৩ হাজার কোটি টাকা। খাদ্যশস্যের বিশাল ক্ষতিকে কেউ কেউ বোরো ফসলের দাফন বলে মন্তব্য করেছেন। বিশাল পরিমাণ ফসলহানির প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এ সুযোগে একশ্রেণীর মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা চালের দাম ইচ্ছে মতো বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে জেলায় খাদ্যভাবে দুর্ভিক্ষের অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। জেলা জুড়ে কৃষক বাঁচাও আন্দোলনে রাস্তায় নেমে পড়েছেন হাওড় পাড়ের মানুষেরা। দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জোরালো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছেনি হাওড় এলাকায়। পিআইসি ও ঠিকাদারেরা হাওড় এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কোথাও কোথাও কেউ গণধোলাইয়ের শিকার হচ্ছেন। পরপর দু’বার ফসলহানির জন্য হতাশার কফিনে ডেকে যাচ্ছে কৃষকের জীবন। বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারানোর বেদনায় লাখো কৃষক বিলাপ করে কাঁদছেন। সুনামগঞ্জসহ পুরো হাওড়াঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকা বোরো ফসলকে কেন্দ্র করে। একে ঘিরেই রচিত হয় কৃষকের সুখ দুঃখের গল্প। হাওড় এলাকার ২৫ লাখ মানুষ বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বোরো ছাড়া অন্যকোন বিকল্প ফসল নেই তাদের। হেমন্তে কৃষিকাজ ও বর্ষায় হাওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এ জেলার অধিকাংশ মানুষ। কৃষি ও মাছ ধরা তাদের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকা- যুগের পর যুগ ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর বোরো মওসুমে কৃষক ধার দেনা করে জমিতে ফসল চাষাবাদ করেন। ফসল ঘরে উঠালে তাদের জীবনের গতি ফিরে আসে। প্রতিবছর পাউবো কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফসল রক্ষা বাঁধে কিন্তু পিআইসি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মিলে মিশে লুটেপুটে খায় লাখো লাখো কৃষকের রিজিক আর জনপদে নেমে আসে খাদ্যাভাব ও হতাশার কালো মেঘ। কষ্টের কালো জল ঢেউ আর হাওড়ের ঢেউ একাকার হয়ে ভাসছে স্রোতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়েছে গত মঙ্গলবার রাত ৮ টা পর্যন্ত ৯০ হাজার হেক্টর জমিন কাঁচাধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে আর ১ লাখ ২৫ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসেবে পানিতে ডুবে দেড় লাখ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে আর এতে ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির জন্য সৃষ্ট আগাম বন্যায় জেলার সবকটি নদনদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সকল বাঁধের ডিজাইন ফেল করে হাওড়ের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট আবহওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, আরও ক’দিন টানা বৃষ্টি হতে পারে ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তবে আর বৃষ্টিপাত না হলে এ অবস্থার সামান্য উন্নতি হতে পারে। এ অবস্থায় চলছে চারদিকে আহাজারি। কোথাও দাঁড়াবার জায়গা নেই। সবই তলিয়ে গেছে। সর্বনাশী বন্যা কেড়ে নিয়েছে বছরের খাবার। জীবন কোথায় ঠেকবে চিন্তায় আনমন হয়ে পড়েছে কৃষক। ইতিমধ্যে গবাদি পশুর খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গো-খাদ্যের অভাবে গরু বিক্রি করছেন সস্তায়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েই চলছে। চালের মূল্যে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শিলা বৃষ্টিতে অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে গেছে আবাদকৃত সবজি। সব হারিয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছেন কৃষক। বেঁচে থাকার অবলম্বন বলতে অবশিষ্ট কিছু নেই। খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ির ঘটনাও ঘটতে পারে এমনটাই আশঙ্কা জেলাবাসীর। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণে স্বেচ্ছাশ্রমে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জাহেদুল হক জানান, যত দিন যাচ্ছে তত পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। যে ফসল ডুবে গেছে তা আর কৃষকের কোনো কাজে লাগবে না। ইতিমধ্যে সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণের কাজ শুরু করেছেন তারা। সে জন্য কৃষি বিভাগের প্রতিটি উপজেলার কর্মরত কর্মকর্তারা তৎপর রয়েছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসার উদ্দিন জানান, অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসল রক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এছাড়া সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ফসলের ক্ষতি সাধিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক একেএম মমতাজ উদ্দিন জানান, বাঁধ নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যে যত টুকু কাজ করেছে ততটুকুর বিল পাবে এর কোনো ব্যতয় ঘটবে না।

 

৬/৪/২০১৭/১৫০/সা/ফা/