কীভাবে সহপাঠীর সাথে গড়ে উঠবে সুসম্পর্ক…

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমshitt

সহপাঠী মানেই বন্ধু নয়, আবার সহপাঠী মানেই প্রতিযোগী নয়, শত্রু নয়। তাহলে সহপাঠী কে? একই ক্লাসে বা একই ইয়ারে, একই সাবজেক্টে যারা একসাথে পড়েন তারাই সহপাঠী।

শিক্ষাজীবনে সুসম্পর্ক কার সাথে কীভাবে তা পালন করতে হবে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

প্রথমেই আমরা দেখি যে, কেন সহপাঠীর সাথে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন:
আশু লাভ- নিজের চারপাশে ইতিবাচক পরিবেশ বজায় থাকে আর আমরা জানি যে, যেখানে যত বেশি সময় কাটানো হয়, যাদের সাথে যত বেশি থাকা হয় সে স্থানের, সে মানুষগুলোর প্রভাব তত পড়ে। সহপাঠীদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাটানো সময়গুলোকে প্রশান্তিময় করবে। নয়তো তাদের সাথে খারাপ সম্পর্কজনিত টেনশন শুধু পড়ায় না, অনেক কাজে মন বসাতে দেবে না।

দীর্ঘমেয়াদী লাভ-সহপাঠীদের সাথে সুসম্পর্ক সংযোগায়নের দক্ষতা বাড়ায়:
সহপাঠীদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা আমাদের মধ্যে সংযোগায়নের দক্ষতা বাড়াবে যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদেরকেই লাভবান করবে।

দীর্ঘমেয়াদী লাভ-সহপাঠীদের সাথে সুসম্পর্ক ভবিষ্যত কর্মজীবনের বিস্তৃত নেটওয়ার্কিং-এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে :
সহপাঠীদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক দিয়ে তৈরি করা বিস্তৃত নেটওয়ার্কিং ভবিষ্যতের কঠিন প্রতিযোগিতাময় কর্মজীবনে সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

সহপাঠীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বাধা/ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসতে পারে?

1. অসুস্থ প্রতিযোগিতা :
অন্যদের টপকে যাওয়ার এ দৌড় চলে ক্লাসে ফার্স্ট বেঞ্চে বসা নিয়েও। স্কুলে না হয় অল্প বয়সের এ আবেগকে মাফ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও যদি কেউ এরকম করেন তাহলে কী বলবেন?
২. বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ :
এ বৈষম্য অর্থের কারণে হতে পারে, জেন্ডার ইস্যু নিয়ে হতে পারে। ক্লাসে অনেক সময় কিছু টপিক নিয়ে শিক্ষক আলোচনা করেন। তখন ছেলে-মেয়েদের পৃথক পৃথক রুচি, অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তখন ছেলে সহপাঠী মেয়ে সহপাঠীদের প্রতি এবং মেয়েরা ছেলে সহপাঠীদের প্রতি যদি কটাক্ষ, বিদ্রুপাত্মক আলোচনার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন সেটা তাদের সুসম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে।
তারপরে আসে আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ। অর্থনৈতিক অবস্থা কম-বেশির কারণও কখনো কখনো সুসম্পর্ক তৈরি হতে বাধা দেয়।
৩. অবজ্ঞাসুলভ আচরণ :
অন্যের পোশাক, ধর্ম, রুচি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার ফলেও সম্পর্ক নষ্ট হয়। এগুলো আসলে সহপাঠী হিসেবে এক ক্লাসে থাকতে অস্বস্তিকর একটি আবহ তৈরি করে। অশ্রদ্ধাবোধ বাড়ায়।
৪. টাকা-পয়সার লেনদেনে জড়িয়ে পড়া :
বর্তমানে বিভিন্ন পার্টির চল বেশ বেড়েছে, গিফট কেনার ব্যাপারে অনেক সময় দেখা যায় কেউ কেউ এসবের পক্ষপাতিত্ব না বা কিনতে পছন্দ করছেন না, খেতে যেতে চাইছেন না। কারো কারো কাছে টাকাটা ম্যানেজ করাও বেশ কষ্টকর। তখন তার প্রতি বাকিদের আড়চোখে চাওয়া, কথা বলা কমিয়ে দেয়া বা কখনো খোঁটা দেওয়া- এ ব্যবহার সম্পর্ক নষ্ট করে।
কিছুদিন আগে শেয়ার ব্যবসা, এমএলএম, ডেসটিনির কাজকর্মে অনেক ছাত্রছাত্রী জড়িয়ে গিয়েছিলেন। সহপাঠীদের প্ররোচনায় এ ধরনের ব্যবসায় পা বাড়িয়ে পরে তাদের সাথে কমিশন পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে আর্থিক জটিলতা তৈরির ফলে জানের দোস্তি একসময় জানের দুশমনীতে পরিণত হয়েছে।
৫. সময় দেয়া বা না দেয়া নিয়ে সম্পর্কের ফাটল হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ কিছু সহপাঠী থাকেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত, সাংসারিক, স্বামী, শ্বশুড়, শাশুড়ির কথা শেয়ার করতে চান, তখন অন্য সহপাঠী যদি শুনতে আপত্তি জানান বা আলোচনায় জড়াতে না চান তবে তিনি মনোকষ্টে ভুল বুঝতে থাকেন।
৬. তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা না করা নিয়ে সম্পর্কের ফাটল হতে পারে। সহপাঠীকে বিশ্বাস করে কেউ একটি কথা বললো যেন একটু নিজেকে হাল্কা করতে পারে এবং একজনকে কথাটা বলার পর অনুরোধও করলো যে তা যেন গোপন থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে তার সাথে সম্পর্কের একটু অবনতি হওয়ায় কথাটি সবার কাছে বলে দিলো।

এক ছাদের নিচে ক্লাস করছি, পাশে বসছি, তাই সুসম্পর্ক থাকতে হবে সবার সাথে।এই সহপাঠীর মধ্য থেকেই বন্ধু বানাতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে বন্ধুকে এই গুণগুলোর অধিকারী হতে হবে। শিক্ষার্থী কণিকায় যেমন আছে- মেধাবী, সহানুভূতিশীল, সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বাদবাকি সবাই হোক ভালো সহপাঠী আমাদের দিক থেকে।

শুধু প্রতিপক্ষের কৌশল নয়, নিজেকেও জানতে হবে সুসম্পর্কের কিছু কিছু কৌশল। এবার আমরা দেখি যে, কীভাবে সহপাঠীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে

– ক্লাস চলাকালে শিক্ষকের কোনো লেকচার পয়েন্ট মিস হলে সে সময়ই পাশেরজনকে জিজ্ঞেস করবেন না। তার খাতা টেনে নেবেন না। প্রয়োজনে ক্লাসের পরে খাতা চেয়ে নিন। এবং যথাসময়ে সেই খাতা কপি করে ফেরত দিন। কপি করতে গেলে পৃষ্ঠা ভাঙবেন না। কলমের দাগও দেবেন না। আর যিনি খাতা দেবেন তার জন্যে বলছি, আসলে খাতা দিতে কার্পণ্য বোধ করবেন না। কারণ, এটা তো মার্কেট ইনফরমেশন। স্যার সবার উদ্দেশ্যেই দিয়েছেন।
– ক্লাস পেজেন্টেশনে শিক্ষক যদি কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেন, তাহলে সহপাঠীকে নাজেহাল করার অভিপ্রায়ে প্রশ্ন করবেন না। আপনাকেও হয়তো কোনো একদিন সহপাঠীর এ অবস্থানে দাঁড়াতে হতে পারে।
– পড়েছেন কি পড়েন নাই-এ নিয়ে স্যাবোট্যাজ করার চেষ্টা করবেন না। কারণ প্রকৃতির প্রতিশোধ নির্মম হতে পারে। আর সহপাঠী কী পড়ছে আর কী পড়ছে না তা শুনে নিজের পড়ার প্ল্যান নষ্ট করবেন না।
– অন্য কোনো সহপাঠীর নেতিবাচক কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো সহপাঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করবেন না।
– কথা যত বুঝে শুনে বলবেন এবং যত কম বলবেন তত ভালো। নিজেকে স্মার্ট প্রমাণের জন্য অনেক কথা বলা, কিংবা ‘প্রচলিত স্টাইলে ট্রেন্ডি’ হওয়ার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, সবাই ব্যতিক্রমকেই শ্রদ্ধা করে।
– সহপাঠীর কোনো আচরণেই প্রভবিত হবেন না। এক বা দুই দিনের আচরণে তো নয়ই। আপনি আপনার মতো প্রো-একটিভ থাকুন। পরিস্থিতি নিজেই নিজের খেয়াল নেবে।
– যদি প্রশংসা একান্ত করতেই হয়, সহপাঠীর সৎ প্রশংসা করুন, তেল মারতে যাবেন না। সৎ প্রশংসা সহপাঠীর আত্মমর্যাদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। আপনার নাম তার ‘গুড বুক’-এ থাকবে বহুদিন।
– কোনো ডিজনেন্সে বা নেতিবাচক কথায় প্রভবিত হবেন না, খেপবেনও না।
– খেলা বা পরীক্ষায় সহপাঠী আপনার চেয়ে ভালো করলে আপনি এগিয়ে যেয়ে অভিনন্দন জানান।
– সহপাঠীর উপকার হবে এমন কাজ করতে পারলে তা করা যেতে পারে কিন্তু তা নিজের সময়, অর্থ, পড়ালেখার ক্ষতি করে নয়।
– সহপাঠীর কাছে কোনো ফেভার যদি চাইতেই হয়, সমমর্যাদার কথা মনে রেখে চাইবেন। সেইসাথে এটাও ভেবে নেবেন ভবিষ্যতে এর জন্যে কতটুকু মূল্য দিতে হতে পারে।
– কারো ব্যক্তিগত কথা বেশি শুনতে না চাওয়া ভালো।
– সহপাঠীর সাথে সম্পর্ক কখনোই খারাপ হতে দেবেন না। ভুল যদি আপনার হয়, সাথে সাথে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন এবং এই আচরণের পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেজন্যে মনে মনে তওবা করুন।
-আর যদি কখনো মনে হয়, কোনো কোনো সহপাঠীর সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে, বা সে আমাকে পছন্দ করছে না, মেনে নিতে পারছে না তখন নিজেকেই উদ্যোগী হয়ে তা মিটমাট করতে হবে।

 

৩/৪/২০১৭/১০০/সা/ফা/