শরৎকাল, বৃহস্পতিবার, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,১৪ই সফর, ১৪৪২ হিজরি, সন্ধ্যা ৬:৪৬
মোট আক্রান্ত

৩৬৪,৯৮৭

সুস্থ

২৭৭,০৭৮

মৃত্যু

৫,২৭২

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৯৯,৯২৮
  • চট্টগ্রাম ১৮,৭৩৯
  • বগুড়া ৭,৫৯৮
  • কুমিল্লা ৭,৪৬১
  • ফরিদপুর ৭,১২৯
  • সিলেট ৬,৮৫০
  • নারায়ণগঞ্জ ৬,৭৩৭
  • খুলনা ৬,৩৫৭
  • গাজীপুর ৫,৪৩০
  • নোয়াখালী ৪,৯৬০
  • কক্সবাজার ৪,৭০৭
  • যশোর ৩,৮৭৬
  • ময়মনসিংহ ৩,৬৬৪
  • বরিশাল ৩,৪৯১
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,৪৭৬
  • দিনাজপুর ৩,৩৭০
  • কুষ্টিয়া ৩,২৬৫
  • টাঙ্গাইল ৩,১০৮
  • রাজবাড়ী ৩,০৪৬
  • রংপুর ২,৮০৮
  • কিশোরগঞ্জ ২,৭৯০
  • গোপালগঞ্জ ২,৫৬৪
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২,৪৫৩
  • সুনামগঞ্জ ২,৩৩৪
  • নরসিংদী ২,৩০৬
  • চাঁদপুর ২,২৯০
  • সিরাজগঞ্জ ২,১৪৯
  • লক্ষ্মীপুর ২,১২৮
  • ঝিনাইদহ ১,৯১৮
  • ফেনী ১,৮৪৮
  • হবিগঞ্জ ১,৭৪৫
  • মৌলভীবাজার ১,৬৯২
  • শরীয়তপুর ১,৬৯০
  • জামালপুর ১,৫৩১
  • মানিকগঞ্জ ১,৪৯৮
  • মাদারীপুর ১,৪৬৩
  • চুয়াডাঙ্গা ১,৪২৩
  • পটুয়াখালী ১,৪১৮
  • নড়াইল ১,৩৩১
  • নওগাঁ ১,৩১৬
  • গাইবান্ধা ১,১৬৪
  • পাবনা ১,১৩১
  • ঠাকুরগাঁও ১,১১৯
  • সাতক্ষীরা ১,০৯৫
  • জয়পুরহাট ১,০৮৭
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • পিরোজপুর ১,০৭৫
  • নীলফামারী ১,০৫২
  • বাগেরহাট ৯৮৯
  • নাটোর ৯৮৭
  • বরগুনা ৯১১
  • মাগুরা ৯০৭
  • কুড়িগ্রাম ৮৯৭
  • রাঙ্গামাটি ৮৯৪
  • লালমনিরহাট ৮৫৪
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৭৭৫
  • বান্দরবান ৭৭১
  • নেত্রকোণা ৭২৪
  • ভোলা ৭২৪
  • ঝালকাঠি ৬৯৯
  • খাগড়াছড়ি ৬৮০
  • মেহেরপুর ৬১১
  • পঞ্চগড় ৬১০
  • শেরপুর ৪৬৬
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর |

সারাদেশ

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

কথাশিল্পী শান্তা ফারজানার গল্প: মোরগ পোলাও এবং এক দূরালাপনী

ডেস্ক রিপোর্ট ,বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

আস্ত মুরগির রোস্ট। ঘি মসলায় লোভনীয়। একপাশে মটর পোলাও সফেদ বাসমতি চাল। সিরামিকের বাটিতে হাড়সহ গোশত। খাসি কিংবা গরুর। সাথে বাইম মাছের সুস্বাদু ভাজাও আছে। খুব আয়েশ করে খেতে থাকে পাপন। খেতে খেতে সালাদের বাটিটা কাছে টানে। বাহ্! কচি শসা পাওলা বারে কাটা, সাথে দেশি পিঁয়াজ। একটা কাঁচা মরিচে কামড় লাগায়। উম্…। শত ভাগ মজা আসছে এখন। মাথা দুলাতে দুলাতে খেয়েই চলে। একটু বোরহানি হলে দারুণ হতো। কচি আম আর টক দইয়ের। ওফ্! বু…য়া…

ধড়মড়িয়ে উঠে আসে পাপন। চোখ কচলাতে থাকে। কোথায় গেল মোরগ পোলাও, কচি আমের বোরহানি। ধ্যাৎ! ঘাড়টা ব্যথা করতে থাকে। হয়তো উল্টোপাল্টা ঘুম হয়েছে। কিংবা ঘুমই হয়নি। পেটে ভীষণ ক্ষুধা। মাথাটাও ঝিম্ ধরে আছে। চাদর ছাড়া বেডিং। কভারবিহীন বালিশটা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পায়ের কুচকিতে ভীষণ চুলকাচ্ছে। ফুলে লাল টম টম। তোষকটাকে অনেকদিন রোদে দেয়া হয় না। খুব সম্ভবত ওতে ছাড়পোকার পরিবার কিংবা সমাজতন্ত্র বানিয়ে বসে আছে। রাতে গা জ্বালিয়ে কামড় কাটে। পোকাগুলো এতো অদ্ভুত যে চোখেও দেখা যায় না; যেন অদৃশ্য। কাঁধ চুলকাতে চুলকাতে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় পাপনের। সামনের দেয়ালে লাগানো আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছে মনিরুল। পাপন-শফিক-মনিরুল মেসে রুমভাড়া করে থাকে। তিনজনই ব্যাচেলর। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজ করে।

-মনিরুল, টাকার জোগাড় হলো কিছু? তটস্থ কণ্ঠে প্রশ্ন করে পাপন।

-নারে, আজ হবে বলে মনেও হয় না।

-শফিক কোথায়?

-কী জানি! কিছুই তো বলে নাই, ফোনও করলো না। মনে হয় রেখার বাসায়…

-অ…। আর কিছু বলে না পাপন। শরীরে বিভিন্ন জায়গায় কুটকুট করছে। চুলকাতে চুলকাতে মেজাজটা আরো খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ একটা ঢাউশ সাইজের খয়েরি পোকা গুটি গুটি হেঁটে চলে ঠিক ডান পায়ের পাশে। পাপনকে নড়েচড়ে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি হাত-পা গুটিয়ে নেয়। পড়ে থাকে মরার মতো। দেখলে কেউ বুঝবেই না এটা কী! ওটার অভিনয় দেখে মেজাজ চরমে ওঠে পাপনের। শালার হাত্তি! এত্তো রক্ত খাইলা এখন আবার অমিতাভ বচ্চন সাজো! বলতে বলতে হাতের কাছের আচারের বয়ামটা দিয়ে চেপে ধরে। পুটুস…। রক্ত বের হয়ে ভর্তা গলে যায় পোকাটা কাগজ দিয়ে বয়ামটা মুছে বিছানা ছাড়ে পাপন। গোসল সেরে পা বাড়ায় অফিসের পথে।

-এ্যই তুমি শুনতে পাচ্ছ?

-উ…হু হু বল…।

-সত্যি করে বলতো মিনিট পনের হয়ে গেল ফোন করেছি, তুমি শুধু হু আর হ্যাঁ- এসবই করছো। আর কিছু বলছো না যে? তোমার কী হয়েছে?

-না, না রুবি কিচ্ছু না। হু কী যেন বলছিলে বল…।

-বলছিলাম বাপ্পার বান্ধবীর বিয়ে। ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই জাম বেগুনী শাড়ি পরবে। আম্মার অমন শাড়ি আছে। তবে বস্নাউজ বানাতে হবে আর জাম-সোনালি একটা কান গলার সেট লাগবে। বিকেল পাঁচটার পর তুমি যদি…

-ও আচ্ছা আচ্ছা। রুবি, বাপ্পাটা যেন কে? মানে তোমার মামার ছেলে নাকি চাচাতো…

-ধ্যাৎ…

টু টু টু টু টু টু …।

ওপাশ থেকে কেটে দিয়েছে। এত্তো অভিমান…। থাক্ । ফোনটা পকেটে রেখে দেয় পাপন। বাপ্পা…বাপ্পা। ভাবতে থাকে- ছেলেটা যেন কে? আর ওর বোনের বান্ধবীটাই বা কে? মনে করতে পারলো না সে। যাক, অফিসের বাইরে এসে সিগারেট ধরাল। সকাল থেকে এই নিয়ে দুটো হলো। পকেটে মাত্র বাকি একটা। পেটে এতো বেশি ক্ষুধা যে মাথাটা ঝিম ধরে আছে। কাল রাত থেকে পেটে কিছুই পরেনি। গত দুপুরে দুটো তন্দুরী আর সবজি এই শেষ। বাসায় ফিরে দেখে চাল নাই। মাসের সাথে সাথে খুচরা খাদ্যদ্রব্য যেমন বিস্কিট, কেক, কলা ইত্যাদি ইত্যাদিও শেষ। গুঁড়া দুধের একটা টিনের কোটায় পাপন অবশ্য প্রতিদিন ভাঙতি কিছু টাকা পয়সা রাখে। শফিক-মনিরুলের প্রয়োজন হলেই ওখান থেকে ধার নেয়। আবার সুবিদামতো রেখে দেয়। কথায় বলে, কপাল পুড়লে সবদিক থেকেই পোড়ে। ঐ কৌটাটাও কাল খালি ছিল। মনিরুলের পকেটটাও ফুটা। আর শফিকটাতো উধাও রীতিমতো। নিজের পকেটে অবশিষ্ট মাত্র তের/চৌদ্দ টাকা।

অফিসে ফিরে আসে পাপন। সে একটা ছোট খাট ফার্মে কাজ করে। ঢোকার পথে পশ্চিম পাশেই তার ডেস্ক। হাতলছাড়া কাঠের চেয়ারটাতে বসে বসে ভাবতে থাকে। টাকা-টাকা, কোথায় পাওয়া যায়। বেতন পেতে আর দিন তিনেক বাকি।

তি-ন-দি-ন! নাহ্। এভাবে থাকা অসম্ভব। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে। আরে রানা ভাই; গত মাসে বেতন পাওয়ার পরই বিভিন্ন খুচরা সমস্যায় জর্জরিত রানা ভাই কে সে পাঁচশ টাকার কড়কড়ে একটা নোট ধরিয়ে দিয়েছিল। একদমই মনে নেই। সে চায়নি আর রানা ভাইও কিছু… আচ্ছা থাক্।

পাপন মাথা বাড়িয়ে রানা ভাইয়ের টেবিলের দিকে তাকায়। লোকটা ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত। আস্তে আস্তে যায় তার টেবিলে।

-আরে পাপন সাহেব কী অবস্থা ভাই ক্যালকুলেটরের বাটন থেকে চোখ না উঠিয়েই বলে মানুষটা।

-এই তো… তা আপনার কী খবর?

-আমার! চোখ থেকে চশমা খুলে সুন্দর করে হাসে মানুষটা। চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ী। মোল্লার দৌড় মসজিদ আর কি!

-রানা ভাই যদি কিছু মনে না করেন…। একটু ইতস্তত বোধ করে পাপন। টাকাটা…

-আরে পাপন সাহেব; সরি ভাই… ভীষণ সমস্যায় আছি যাকে বলে কিনা মাইনকা চিপায় আটকে গেছি আর কি। চিন্তা করবেন না ভাই, আগামী পরশু-তরশু বেতন পেলেই পেয়ে যাবেন। আমি অত্যন্ত দুঃখের…

-আরে না না… ঠিক আছে। সরি ভাই, যদি পঞ্চাশ-ষাট টাকা হবেতো?

-ভাই বিশ্বাস করেন আমার পকেটে মাত্র বার টাকা দেখেন, দেখেন বলে পকেট থেকে পাঁচ টাকার দুইটা নোট আর খুচরা পয়সা কয়টা বের করে দেখালো। বাসায় ফেরত যাবার ভাড়া আর বাচ্চা মেয়েটার জন্য চকলেট এই…।

পাপন হাসির বিনিময়ে হাসি দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। মনটা খুবই খারাপ। পেটের মধ্যে এতোক্ষণ ইঁদুর ছুটছিল। এখন বোধহয় বাঘ-ভাল্লুকও লাফালাফি করছে।

-হ্যালো মনিরুল… টাকা পয়সার কিছু জোগাড় হইলো…?

-নারে… আজকে বোধহয়…?

‘না; শুনেই ফোনটা কেটে দেয় সে। ব্যালেন্স চেক করে। আর মাত্র ২ টাকা আছে। ধ্যাত্ …। পা ঝাঁকিয়ে, চুল হাতিয়ে, ঠোঁট কামড়ে, অযথাই ফাইলপত্র ঘেঁটে ঘেঁটে সময়টা পার করলো সে। ঘড়ির কাঁটাও শক্র বনে গেছে। চলতেই চাচ্ছে না আর। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুকনো ফাটা খেতের মতো শুকিয়ে আসে পাপনের পেটের নাড়ি ভুঁড়িগুলো। জ্বলতে থাকে চুঁ চুঁ করে। ঘড়িতে ঘণ্টা-মিনিট- সেকেন্ড একটা বাজার নির্দেশ দেয়। পাপনও একলাফে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায়। অফিস বলে কথা নতুবা সুপার ম্যানের মতো উড়ে উড়ে বেরিয়ে যেত এই চার দেয়াল থেকে। হাঁটতে হাঁটতে সোজা এগিয়ে যায় মোড়ের দিকে। সেখানেই কোনায় মধু মিয়ার দোকান। ছোট্ট। টিনশেডের। কোথা থেকে যেন দুটো বেঞ্চি যোগাড় করেছে মধু মিয়া। দুটোতেই কয়েকটা করে ফুটো। মধুমিয়া এগার/বারো বছরের কিশোর। চা-বিস্কিট-কেক-পাউরুটি-কলা ইত্যাদি ইত্যাদি বিক্রি করে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সময় বের করে পড়াশোনাও করে। কখনো কখনো দোকানটাতে ওর ভাই বসে। মধুমিয়া খুবই ভদ্র এবং ভালো স্বভাবের ছেলে। দেখলেই লম্বা সালাম দেয়।

-স্যার, শরীরটা ভালো? বাসার সবাই ভালো? আপনার আব্বা-আম্মা-ভাই-বোন সবাই ভালো আছে?

ওর প্রশ্ন শুনলে খুবই মায়া লাগে। এভাবে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না কিনা। ওরা অফিসের ৪/৫ জন হলো আর দোকানের রেগুলার কাস্টোমার। কেউ যদি তাকে প্রশ্ন করে- কিরে, তোর নাম মধু কেনরে? তাহলে সে মিষ্টি হেসে উত্তর দেবে- আমার জন্মের সময় মৌমাছি ঘরের আসপাশে ঘুর ঘুর করতাছিল তো সেজন্য আম্মা আমার নাম। মধু রাখছে।

পাপন দ্রুত পা চালায়। মধুর সাথে তার পরিচয় তার অনেক দিনের। কখনো কখনো ১০/১৫ টাকা বাকিও থাকে। দুপুরের ব্রেকটা আজ মধুর ওখানেই কাটাতে চায়। পাউরুটি-কলা আর এক গরম গরম চা। ব্যাস্ বাকিতে যেতে হবে অবশ্যই। সে চার রাস্তার মোড় পেরিয়ে গলিতে ঢুকে গেল সোজা। কিছুটা পথ যেতেই বিহ্বল হয়ে পড়লো। চোখ কচলে নিল হাত দিয়ে। দোকানটা বন্ধ! তবুও হেঁটে হেঁটে কাছে গেল। মধু… ঐ মুধমিয়া… ঘুমাও নাকি… দোকানের সামনের অংশে বার কয়েক টোকা দিল। এটা সম্ভব নয় যে, চার/পাঁচ ফুট ছোট্ট দোকানে এতো ঠাসা মালপত্রের মধ্যেও কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু পাপনের তোলপেড়ে পেট মানছিল না। নাহ্… মধু সত্যিই আসেনি। মনটা খুবই খারাপ লাগছে। পেটে মৌচাকের জ্যাম। হু হু করে জ্বলছে তার খাদ্যনালী। কবির ভাষায় ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি…’ কিন্তু এই তপ্ত দুপুরে ক্ষুধায় কাতর পাপনের মনে হচ্ছে- ঝলসানো রুটি যেন পূর্ণিমার চাঁদ… দেখা গেলেও খাওয়া যাচ্ছে না। ধ্যাৎ… রাগে দুঃখে অভিমানে অফিসের দিকে পা বাড়ালো সে।

জহির সাহেবের পেটমোটা লাঞ্চ বাঙ্টা তার চেয়ারের পেছনেই ঝুলছে। সিনিয়র ভদ্র মানুষ। স্ত্রী-সংসারে বর্তমান স্বামী। সঠিক সময়ে আসেন, সঠিক সময়ে যান। মাঝের সময়টা কর্মব্যস্ত থাকেন; এতটাই বেশি যে তাকে যদি কেউ চেয়ার থেকে উঠিয়ে স্বর্গে পাঠিয়ে দেয় তবুও তিনি হিসাবই কষতে থাকবেন। তার দুপুরের খাবার খেতে খেতে প্রায়ই দুপুর আড়াই-তিনটা এমনকি সাড়ে তিনটা বেজে যায়। আজও তিনি কর্মসাগরে ডুবে আছেন। কোনো দিকেই খেয়াল নেই। পাপন আরচোখে বার কয়েক তার বাঙ্টার দিকে তাকালো। জহির সাহেবের ঠিক কাছেই সুরমা কাজ করছে। মেয়েটা দিনে ১০/১৫ বার ওয়াশরুমে যায়। তাও আবার ভ্যানিটি ব্যাগটা কাঁধে করে নিয়ে যায়। পাপন বুঝতে পারে না মেয়েটার কী ডায়াবেটিস নাকি মেকআপ ঠিক করতে যায়।

পাপন ভাবতে থাকে সুরমা যখনই চেয়ারটা ছাড়বে তখনই জহির সাহেবের বাঙ্টা…। ভাবতে ভাবতে পাপনের ছোট বেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে। ওদের গ্রামে একবার চোর ধরা পড়েছিল। তিন বন্ধু একসাথে চুরি করতো। কী? খাবার! দুইজনে পাহারা দিত আর একজন রসুই ঘর থেকে খাবার নিয়ে ভাগতো। গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো। চাল-ডাল চুরি করে না, গাছের সবজি-ফল চুরি করে না, খোয়াড় থেকে মুরগি চুরি করে না। চুরি করে শুধু রান্না করা খাবার। এতো অলস চোর। একবার পাপনের ফুফুর বাড়িতে ভাত আর হাঁসের গোসত চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। আর যায় কই! দে ধরে মাইর! জোরসে ঠুসির পর তাদের ‘হিউম্যান সয়েল’ (!) খেতে বাধ্য করা হয়েছিল । যাতে আর কখনোই চুরি না করে; কথাটা ভাবতেই পাপনের বমি এসে পড়েছিল। ও-য়া-ক। বোধহয় শব্দটা একটু জোরেই হয়ে গিয়েছিল। ঐপাশে চেয়ার থেকে আকবর সাহেব উঠে আসেন।

-কী ব্যাপার, পাপন সাহেব, আপনার কি শরীর অসুস্থ নাকি? জবাবে খুব বলতে ইচ্ছা করে, ভাইরে ভাই পেটটার যদি মাঘ মাসের গাছের মতো হাল হয় তাইলে শরীর আর ভালো থাকে কেমনে। কিন্তু মুখে কিছুই বলে না। রানীক্ষেতে আক্রান্ত মুরগির মতো ঝিম্ মেরে থাকে। জবাব না পেয়ে আকবর সাহেব আরো কাছে এসে দাঁড়ায়। ভাই, সারাদিন আপনার মুখটা শুকনো ছিল, একটু অন্য মনষ্কও। এখন আবার বমি বমি ভাব। ছুটি নিয়ে নেন না। আর তো মাত্র দুই ঘণ্টা বাকি…। কথাগুলো বলে আকবর সাহেব নিজেই স্যারকে বলে পাপনের জন্য অনুমতি নিয়ে আসে। পাপন একটু কাচুমাচু বোধ করে। কিন্তু মনে মনে ঠিকই খুশি হয়। যাক বাবা বাঁচা গেল। রাজা-বাদশাদের আমলে মাটির নিচে চাপা দিয়ে দিনের পর দিন শাস্তি দেয়া হতো। অফিসটাকে ও রকমই লাগছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটতে শুরু করলো।

মতিঝিল থেকে পায়ে হেঁটে পল্টন। বাসে চড়ে ফার্মগেট। বাসের কন্ডাক্টরকে মামা-চাচা বলে একটা টাকা বাঁচাতে পেরেছে। আর আছে মাত্র দশকি এগার টাকা। ফার্মগেটের মোড়ে বাতাসে খাবারের সু-ঘ্রাণ। বিভিন্ন ধরনের কাবাব, চপ, সিঙ্গারা, রোল সমুচা। টুকিটাকি কেনা বেচা চলে। নানাপদের খাদ্যদ্রব্যের সুস্বাদু ঘ্রাণ তার আহত নাকে সুড়সুড়ি দিতে থাকে। পাপনকে সান্ত্বনা দেয় পাপন নিজেই। মনে মনে। মোড়ের বাস স্টপে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে। পকেটটা প্রায় খালিই। আর মোবাইলে মাত্র দুই টাকা। একটাই ফোন করা যাবে। কী করা যায়…। বাসায় গেলেও কাহিনী পরিবর্তন হবে না। এক বন্ধু অবশ্য আছে, খামার বাড়ি। নাহ্… উল্টো পাওনা ফেরত চেয়ে বসতে পারে। পাপনের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ মনে পরে ফুফুর কথা। আব্বার খালাতো বন। উত্তরায় তাদের বাড়ি-গাড়ি; কঠিন অবস্থা। পাপনকে তিনি অনেক আদর করেন। সে সচরাচর যেতে চায় না। বলে রাখা ভালো, যেতে চায় না। কারণ তার মতে, উত্তরা যাওয়ার চেয়ে মিসরের কায়রো পাড়ি দেয়া অনেক ভালো। যাক্ যা আছে কপালে। ফোনটা হাতে নিল সে। ০১৭১…।

-হ্যালো…।

-হ্যালো ফুফু…পাপন। মোবাইলে টাকা নাই। আমি আসতেছি। আমার হাত একদম খালি ফুফু। কিছু টাকা ধার দিয়েন।

-পাপন শোন আমরা তো একটু ঢাকার বাইরে আছি। সামনের বুধবারে…

বলতে বলতেই লাইনটা কেটে গেল। পাপনের খুব জানতে ইচ্ছা হলো ঢাকার বাইরে কোথায় আছেন তার ফুফু। সে ট্যাঙ্ িনিয়ে চলে যাবে। টাকা নিয়ে ট্যাঙ্ িভাড়া শোধ করে সেখানকারই কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্টে পোলাও-কোরমা খাবে। ভাবনাগুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে মাটিতে মিশে গেল। কষ্টে দুঃখে নিজেই নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। মন চাচ্ছে চেচিয়ে কাঁদে ওর হঠাৎ মনে হলো মাথা ঘুরে পরে যাবে। আর মরে যাবে। আগামীকাল সকালে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত খবর… ছোট এক কলামে… ধ্যাৎ… মরে তো জাহান্নামেই যেতে হবে। সেখানেও খাবার টাবার নেই। সে ফার্মগেটের আইল্যান্ডের বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকে। বুক পকেটে হঠাৎ বেজে উঠে রিংটোন। বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে। মনের দুঃখে ফোনটা রিসিভ করে না। বিকাল পাঁচটা বেজে ত্রিশ; হয়তো রুবি। ফোন রিসিভ করলেই বলবে ‘কেন তুমি আসলা না; জাম সোনালি গহনা কেনার কথা ছিল।’ বাপ্পার বোনের বিয়ে নাকি যেন মায়ের বিয়ে। ধুত… এতো ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে ইচ্ছা করছে না। ফোনটা বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। স্ক্রিনে অপরিচিত নাম্বার…হ্যালো…। হ্যালো পাপন, আমি শফিক। দোস্ তোরা নাকি কাল থেকে না খেয়ে আছিস। সরিরে… শোন্…তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। কিছু টাকা ম্যানেজ করা গেছে। আজ আমরা বাসাতেই মোরগ পোলাও উৎসব করবো। জলদি আয়। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফোন কেটে দিল। পাপন কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে…

১৬/৪/২০১৭/১২০/আ/হৃ/

Share on facebook
Facebook
Share on google
Google+
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

সর্বশেষ খবর

Leave a Reply

সর্বাধিক পঠিত

আরো খবর পড়ুন...

বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম :
প্রধান সম্পাদক : লায়ন মোমিন মেহেদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : লায়ন শান্তা ফারজানা
৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা
email: mominmahadi@gmail.com
shanta.farjana@yahoo.co.uk
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।