ঐক্য গড়ে তোলাই হচ্ছে ভিত্তি…

শান্তা ফারজানা, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

ইতিহাসের আবর্তনের সাথে সাথে মানুষ একের পর এক সভ্যতা গড়ে তুলেছে।  সময়ের প্রয়োজনে মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করেছে, আর এই জোট বা একতা গড়ে তুলতে গিয়ে সম্মুখীন হয়েছে একটি সাধারণ প্রশ্নের। আর প্রশ্নটি হলঃ কিসের ভিত্তিতে আমরা এই একতা ও ঐক্য গড়ে তুলব ? কিসের ভিত্তিতে আমরা জোটবদ্ধ জীবনের সূচনা করব?

এই ঐক্য কি কোন সাধারণ (common) দেশ (land), অঞ্চল তথা ভৌগলিক সীমারেখার উপর গড়ে উঠবে,
নাকি রক্ত সম্পর্কের উপর ,
নাকি একই ভাষার উপর?

আবার অপরদিকে অনেকে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ভিত্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আদর্শ, বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা আর বিবেক বুদ্ধিকে। পশুদের মধ্যেও একতা আছে, তবে তাদের মধ্যে একতার ভিত্তি কি হবে- এই সমস্যা নেই, কারণ তারা শুধুমাত্র পাশবিক তাড়নাতেই তাড়িত হয়। তাদের স্বাধীনভাবে কোন আদর্শ নির্বাচনের ক্ষমতা নেই, তাদেরকে আদর্শগত, বিশ্বাসগত ঐক্যের কথা বলাটা অর্থহীন প্রলাপ।

কাজেই প্রাণীজগতের মাঝে বন্ধন গড়ে উঠে শুধুমাত্র প্রবৃত্তির ভিত্তিতে, ভূমি-বাসস্থান কিংবা রক্ত-প্রজাতির ভিত্তিতে।

অপরদিকে ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই, মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন,ঐক্য গড়ে উঠেছে দুটি ভিত্তিতে। এই দুটি ভিত্তি যেন দুটি সমান্তরাল রেখা, ইতিহাসে ঐক্যের ভিত্তি নির্বাচনের এই দুটি সমান্তরাল রেখা বয়ে চলেছে পাশাপাশি। কিন্তু উভয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান !

১ নম্বর রেখাঃ একটি রেখা ছিল আম্বিয়া(আ)দের, এই রেখাটিধর্ম বিশ্বাসের, যেখানে একতার ভিত্তি ছিল বিশ্বাস ও আদর্শ, আর এ ধরণের আদর্শগত ঐক্যের সর্বোচ্চ উৎকর্ষজনিত মান অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল ইসলামের দ্বারা; বংশ family, গোত্র  tribe, বর্ণ  color, ভাষা  language, ভূগোল  land, সাদা-কালো,আরব-অনারব,উঁচু-নিচু নির্বিশেষে একটি বৃহৎ আদর্শগত global জাতি গঠনের মাধ্যমে, যার নাম ইসলামিক উম্মাহ। এমনকি এই আধুনিক সমাজেও যখন বিভিন্ন ধর্মে কিংবা জাতিতে সমাজের নিম্ন বর্ণের মানুষদের অচ্ছুত বা অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হয়, সাদা-কালো বর্ণবাদ লালন করা হয়, রাজনৈতিক সীমারেখা গড়ে তুলে মানুষের চলাফেরা করার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত করা হয় সেখানে ১৪০০ বছর আগে থেকেই ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে কালো-সাদা বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সালাত আদায়ের, হজ্জ করার।

২ নম্বর রেখাঃ অপর রেখাটি ছিল পৌত্তলিকতার (মূর্তি কিংবা মানব রচিত মতবাদ) যার ঐক্যের ভিত্তি ছিল ভৌগলিক সীমারেখা, সাদা কিংবা কালো গায়ের রঙ, ভাষা, গোত্র-গোষ্ঠী, পেশী শক্তি আর রাজনৈতিক সংগঠন। মেসোপটেমিয় সভ্যতা, ব্যবিলনীয় সভ্যতা, আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থা, গ্রীক, রোম, ইরান-পারস্য, কালডিয়া, আসিরিয়া ইত্যাদি প্রাচীন সভ্যতার সবগুলোর একতার ভিত্তি ছিল এই আসাবিয়াহ জাতীয়তাবাদী প্রভাবকগুলো।

কুর’আনের আয়াতসমূহে এই দ্বিতীয় রেখাটিকে বলা হচ্ছে শয়তান ও তাগুতের রেখা। শয়তান নিজেও তার অহংকার আর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হিসেবে যা প্রকাশ করেছিল তা হল জাতি-বংশ গৌরব, সে বলেছিল যে সে আগুনের তৈরি তাই সে মাটির তৈরি আদমের (আ) থেকে উত্তম।

আর মানব সমাজে এর সমতুল্য অহংকার হচ্ছে নিজের বংশ, জাতি, ভাষা আর রক্তের বড়াই করা। অথচ আদমের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ছিল বিবেক বুদ্ধি, জ্ঞান, আদর্শ আর এ কারণেই মাটির তৈরি আদমকে আগুনের তৈরি শয়তানের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হল। আমরা জানি গোত্র, বর্ণ , বংশ কিংবা রক্তের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে আদমকে ফেরেশতাগণ সিজদাহ করেননি বরং তাঁর ইলমের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে আল্লাহর আদেশে ফেরেশতাগণ তাকে সিজদাহ করেছেন।

চলমান সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে  আশা করি এতটুকু স্পষ্ট যে,
যখন মানুষে মানুষে একতার ভিত্তি হয় ভূমি  কিংবা রক্ত সম্পর্ক সে একতা মানুষেরও আছে আবার পশুদের মাঝেও আছে। মানুষ ও পশু-প্রাণিজগত উভয়ের মাঝেই এটা কমন-সাধারণ, এই ঐক্য কোন বিশেষ বা শ্রেয়তর superior কিছু নয় যার কারণে মানুষ নিজেকে সকল প্রাণীর চেয়ে  শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে,  ভূমি কিংবা রক্তসম্পর্ক কি মানুষের সাথে মানুষের ঐক্য গড়ে তোলার একমাত্র ভিত্তি হবে নাকি এগুলো ছাড়াও অন্য কোন কারণে একতা গড়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নটির উত্তর করার পূর্বে আমাদের জেনে নিতে হবে মানুষের সৃষ্ট বৈশিষ্ট ও বিশেষত্ব সম্পর্কে।

কুর’আনের বর্ণনা অনুসারে, মানুষও একটি পশু, কিন্তু অন্যান্য পশুর সাথে মানুষের পার্থক্য হল মানুষকে রুহ দেওয়া হয়েছে (Divine spirit) যা অন্যান্য প্রাণীদের নেই, অন্যান্য প্রাণীদের রয়েছে কেবল নফস (পশু প্রবৃত্তি)।  তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষ এমন একটি বিশেষ প্রাণী যাকে একই সাথে দুটি বিপরীতধর্মী প্রবণতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যার একটি অপরটির সাথে সাংঘর্ষিক আর এ দুটোর সমন্বয়েই মানুষের কাঠামো ও স্বভাব চরিত্র গড়ে উঠে। পশু প্রবৃত্তি যা মানুষকে টেনে নিচের দিকে নামিয়ে আনে, মানুষকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়ে নামিয়ে এনে অন্যান্য প্রাণির মতই বানিয়ে দেয়, আর মানবিক প্রবৃত্তি চায় মানুষকে উপরের দিকে তুলতে যা অন্যান্য প্রাণির থেকে মানুষকে বিশেষত্ব ও মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব দান করে।  আল্লাহ বলছেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে। অতঃপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি নীচ থেকে নীচে’। (৪-৫, ৯৫)

অন্যান্য প্রাণিদের সাথে মানুষের মিল যেক্ষেত্রে সেটা হল উভয়ের মাঝেই পশু প্রবৃত্তি রয়েছে। কিন্তু কি এই পশু প্রবৃত্তি?

ফ্রয়েড ও ম্যাকডুগাল এর মতে, “প্রবৃত্তি হচ্ছে একটি রহস্যজনক শক্তি যা প্রতিটি জীবের মাঝে কাজ করে, এই প্রবৃত্তি জীবের অগোচরেই বিভিন্ন কাজ করে চলে শারিরীক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে অথচ সেই জীবটি তা নিয়ে চিন্তা ভাবনার সুযোগও পায় না”।

মানুষের মাঝে, এই প্রবৃত্তিগুলো জেগে উঠে তার পশু প্রবৃত্তি থেকে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধা, যৌনতা, লড়াই, ভূমি-বংশ-সম্পদের প্রতি আসক্তি ইত্যাদি।

 

১১/৪/২০১৭/২০০/শা/ফা/