মে 31

উপহার কি ছিল যাতে কপাল খুললো ফরিদার…

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ফরিদা। অনাগত সন্তান নিয়েই নানা স্বপ্নের জাল বুনছিলেন তিনি। কিন্তু তখনই মাথায় বাজ পড়লো, স্বামী আতর মিয়া তাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেছেন। এ খবর শুনে যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।

এ নিয়ে আশপাশের লোকজন নানা ঠাট্টা-মশকরাও করতো। সময়টা আশির দশকের, পঞ্চাশোর্ধ্ব সাভারের কুমারখোদা গ্রামের ফরিদা খাতুনের কাছে ছিল কষ্টের। লোকজনের হাসিঠাট্টা আর টিপ্পনি পেছনে ফেলে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ফরিদা এখন এক জীবন সংগ্রামী সফল নারী। পাথর সরিয়ে বৃক্ষ যেমন প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি সব বাধা কাটিয়ে নিজেকে বিকশিত করলেন ফরিদা। আর তাতে অনুষঙ্গ যেনো ভাইয়ের উপহার দেয়া ৮০ টাকার ভেড়ার ছানা!

৮০ টাকার সেই ভেড়াতেই তার ভাগ্য বদল ঘটে! এ ধরনের গল্প শুনে হয়তো ফরিদার স্বচ্ছল দিনে ফেরার গল্প অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। স্বামী ‘পরিত্যক্তা’ স্বয়ং সংগ্রামী ফরিদার-ই তো বিশ্বাস হয় না!

ফরিদার ভাষ্য, ‘স্বামী রেখে চলে যাওয়ার পর বাবার বাড়িতেই থাকতাম। সেখানেই আমার ছেলে বাবুল হোসেনের জন্ম হয়। সুখের কথা চিন্তা করে মা-বাবা আমাকেও অন্যত্র বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তাতে সায় দিইনি। আমি কারও ওপর নির্ভর হতে চাইনি। বিশেষ করে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধিনি।’

জীবন সংগ্রামে ভাগ্য বদলের বিষয়ে তিনি বলেন, সময়টা ১৯৮৫ সাল। তখন আমার ছেলে বাবুলের বয়স মাত্র দুই বছর। আমার ভাই আবুল হোসেন তাকে ৮০ টাকা দিয়ে একটি ভেড়া উপহার দেন। কে জানতো, ভাইয়ের দেয়া উপহার সেই ভেড়াই তার বোনের সুন্দর ভবিষ্যতের বীজ বপন করবে। সম্প্রতি সাভারের কুমারখোদা গ্রামে কথা হয় ফরিদার সঙ্গে। গোলাপের জন্যেও গ্রামটির বেশ পরিচিতি রয়েছে। তিনি ওই গ্রামের সরকারি আশ্রায়ণ প্রকল্পে ছেলেকে নিয়ে থাকেন।

ফরিদা বলেন, বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৪৯টি ভেড়া আছে। এগুলোর দেখভাল থেকে শুরু করে খাবার দেয়া সবই নিজে করেন তিনি। স্মৃতি আওড়িয়ে ফরিদা বলেন, ‘আমার স্বামী যখন আমাকে ছেড়ে চলে যান তখন আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। তখনও আমি আমার নিজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমি যা পেয়েছিলাম তা হলো একটি ভেড়ার বাচ্চা। তাই আমাকে সেটা দিয়েই শুরু করতে হয়েছিল।’

ফরিদার দৃঢ়তা ও ধৈর্যের গল্প যেন আরও বিস্তৃত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়া এবং আড়াই ডেসিমেল জমির ওপর তার ঘর। তবে দমে যাওয়ার মানুষ নন তিনি। এভাবেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের ঘরের বারান্দায় তিনি বানিয়েছেন ভেড়ার খোঁয়াড়।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় ভেড়াগুলো এই খোঁয়াড়ে ঢোকে আর ঘুমায় সকাল ১০টা পর্যন্ত। সবসময়ই ভেড়াগুলো থাকে ফরিদার চোখে চোখে। প্রতি সকালে নিজ হাতে সেগুলোকে ঘরের বাইরে বের করেন তিনি। মাঠে নিয়ে যান এবং খাবারও দেন সময় করে, বিকেলে বাড়ি নিয়ে আসেন। এভাবেই ভেড়ার যত্নআত্তি করে দিন কাটে তার।

‘এভাবেই গত ৩২ বছর ধরে এই কাজই করছি’- সহাস্যে নিজ থেকেই বললেন ফরিদা। ফরিদার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিলো পাশেই বসেছিলেন সেলিনা আকতার (২৭)। তিনি ফরিদার একমাত্র পুত্রের বউ। শাশুড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো ভেড়া মারা যায়, তাহলে আম্মা (ফরিদা) শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন, খাওয়া-ধাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দেন! যেনো পরিবারের একজন সদস্য মারা গেছে!’

এমনকি একটি ভেড়া বেচলেও মন কাঁদে তার। ভেড়াগুলো তার কথা শোনে। তিনি যেখানে যান, তারাও (ভেড়াগুলো) পিছনে পিছনে সেখানে যায়।’

‘জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভেড়া চড়াবেন আম্মা, কারণ এই ভেড়াই তো তারে নতুন জীবন আইন্যা দিছে’- যোগ করেন সেলিনা।

এক সময় ফরিদাকে নিয়ে যারা হাসিঠাট্টা আর টিপ্পনি কাটতেন, সেই প্রতিবেশীদেরও অনেকে এখন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে অনুসরণ করছেন। খোদেজা খাতুন, ফরিদার প্রতিবেশী। সম্প্রতি তার কাছ থেকেই সাড়ে ৭ হাজার টাকা দিয়ে এক জোড়া ভেড়া কিনেছেন। ফরিদার মতো নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চান তিনিও।

বললেন, ‘আমিও ফরিদার মতো আমার কপাল (ভাগ্য) ঘুরাতে চাই।’ আরো এক প্রতিবেশী রাজিয়া বেগম, খোদেজার মতো তিনিও ফরিদাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন ভেড়া পালনে। চল্লিশোর্ধ্ব এই নারী বলেন, ‘বাসাবাড়িতে কাজ করি। কিন্তু অবসর সময়টায় ভেড়া পালন করে ফরিদা আপার মতো ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে চাই।’

ফরিদা এখন একটি অনুপ্রেরণা ও নতুন পথ দেখানোর নাম। তবে ভুলে যাননি শুরুর দিনগুলোর কথা। সে চিন্তায় ছেলে-নাতনির ভবিষ্যতের জন্য কিছু জমিয়ে রাখছেন। তার ছেলে বাবুল হোসেনের তিনটি সন্তান রয়েছে। সাভার বাজারে রয়েছে তার নিজস্ব ফুলের ব্যবসা। তবে এখনও সংসারের ব্যয় ফরিদাই মেটান।

তার ভাষায়, ‘আমি আমার নাতি-নাতনিদেরও পড়ালেখার খরচাপাতি দেই।’ এমনকি ছেলের বউয়ের অলঙ্কারও নিজের পয়সায় করে দিয়েছি, বলেই তৃপ্তির হাসি হাসলেন ফরিদা।

ফরিদার মুখের সেই হাসি যেনো খাঁটি সোনার চেয়েও দামি। এমন নির্মল হাসির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। তার ভাষায়, ‘মানুষের জীবন চিরদিন একভাবে যায় না। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, সেই ইচ্ছাশক্তি দিয়েই শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পরিস্থিতি মানিয়ে সফল হওয়া যায়।’

আর তাইতো একটি ভেড়ার ছানা থেকে ফার্ম করে দেখিয়ে দিলেন ফরিদা।

৩১-০৫-২০১৭-০০-১১০-৩১-ম-জা