আমদানিকৃত বস্তাভর্তি পণ্যগুলোকে চটের বস্তায় মোড়কজাত…

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

পুরোপুরি প্রস্তুতি ছাড়া চটের বস্তায় সতের ধরনের পণ্য পরিবহন বাধ্যতামূলক করায় দেশব্যাপী পণ্যপ্রবাহে সংকট সৃষ্টির আশংকা দেখা দিয়েছে। চটের বস্তার বাধ্যবাধকতায় অভিযান এবং জেল জরিমানার ঘোষণায় দেশের নানা স্থানে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি চটের বস্তা ছাড়া পণ্য পরিবহন করতে চাচ্ছে না। অথচ গুদামে গুদামে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ছোলা, ভুট্টাসহ হাজার হাজার টন পণ্য পিপি ওভেন বস্তায় রয়েছে। এসব পণ্য পরিবাহিত না হলে দেশের নানা স্থানে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে।

দেশে সতের ধরনের পণ্য পরিবহনে পুরোপুরি চটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা এবং দেশীয় শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করার লক্ষ্যে চটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামুলক করা হয়। ২০১০ সালে প্রথম চটের বস্তার ব্যবহার আলোচনায় উঠে আসে। ওই বছর পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। ওই সময় ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি পরিবহনে চটের বস্তা বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারি ওই আদেশ পুরোপুরি পালন না হওয়ায় এক সময় সব চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আবারো চটের বস্তার ব্যাপারটি আলোচনায় উঠে আসে। ওই বছর এই ছয়টি পণ্য পরিবহন চটের বস্তা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আবারো জারি করা হয়। ২০১৩ সাল থেকে দেশে এই ছয়টি পণ্যে চটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক কড়াকড়িভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

সরকারিভাবে ধান, চাল ও গম বাজারজাত করার ক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তর শতভাগ পাটের বস্তা ব্যবহার করে। কিন্তু আমদানিকারক এবং রাইস মিল মালিকেরা আইনটি উপেক্ষা করে আসছিলেন। এই অবস্থায় নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে পাট মন্ত্রণালয়। রাইস মিল মালিকেরা এই নির্দেশও উপেক্ষা করছিলেন। একই সঙ্গে এর বিরুদ্ধে আদালতে রিটও করা হয়। ওই রিট স্থগিত করলে পাট মন্ত্রণালয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু করে। এই অবস্থায় ধান, চাল, গম, ভুট্টা চটের বস্তায় পরিবাহিত হলেও চিনির ক্ষেত্রে বাড়তি রেক্সিনের বস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছিল। এতে খরচ বেড়ে গেলেও আমদানিকারক এবং শিল্প কারখানার মালিকেরা চটের বস্তার ভিতরে রেক্সিনের বস্তা দিয়ে চিনি সরবরাহ করছিলেন।

চলতি বছরের গত ২১ জানুয়ারি চটের বস্তার ব্যাপারটি আবারো আলোচনায় উঠে আসে। এবার আগেকার ছয়টি পণ্যের সাথে আরো এগার ধরনের পণ্যে চটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। আগের ছয়টি পণ্যের সাথে নতুন করে আটা, ময়দা, মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, তুষ-খুঁত-কুড়ায় চটের মোড়ক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়। চটের বস্তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অভিযানকালে চটের বস্তার পরিবর্তে পলি প্রপাইল ওভেন ব্যাগের ব্যবহার ধরা পড়লে জেল জরিমানা করা হবে বলেও হুশিয়ার করে দেয়া হয়েছে।

এই ব্যাপারে একাধিক আমদানিকারক জানান, বাংলাদেশে বছরে তিন কোটি টন ধান, দুই কোটি টনের মতো চাল, ভুষি, খুঁদ এবং কুড়া মিলে এক কোটি টন, আমদানিকৃত এবং দেশীয় উৎপাদন মিলে ৬৫ লাখ টন গম, ৫০ লাখ টন আটা ও ময়দা, ৮০ লাখ টন আলু, আমদানিকৃত এবং দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত ২৪ লাখ টন চিনি, ভুট্টা ২৭ লাখ টন, দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানি মিলে ২০ লাখ টন ডাল, পেঁয়াজ, রসুন এবং আদা মিলে ২০ লাখ টন পণ্য মোড়কজাতকরণের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল পরিমাণ পণ্য মোড়কজাত করতে পঞ্চাশ কেজি এবং একশ’ কেজির ১২৫ থেকে ১৩০ কোটি চটের ব্যাগ দরকার। এত বিপুল পরিমাণ চটের বস্তা উৎপাদনের অবকাঠামোগত সুযোগ দেশে নেই।

বিজেএমসির আওতাধীন ২৬টি পাটকল থাকলেও ২৩টিতে পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এসব পাটকলে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বস্তার উৎপাদনই ৪০০ টনের বেশি। বিজেএমসির মিলগুলোতে বছরে ৩০ থেকে ৪০ কোটি বস্তা তৈরির স মতা রয়েছে। বেসরকারি কারখানাগুলো দেশে বছরে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি চটের বস্তা তৈরি করতে পারে। এতে করে দেশের এই ১৭টি পণ্য মোড়কজাত করতে ১৩০ কোটি বস্তার মধ্যে ৬০ কোটি উৎপাদিত হলেও বাকি বস্তাগুলোর অভাব থেকে যাচ্ছে। এই ৬০ কোটি বস্তার একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি হয়ে যায়। এতে দেশীয় বাজারে সব সময় চটের বস্তার সংকট লেগে থাকে।

অন্যদিকে চটের বস্তার দাম পিপি ওভেন বস্তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। একটি চটের বস্তার দাম ৭০ টাকা অথচ একটি পিপি ওভেন বস্তা ১৫ টাকায় পাওয়া যায়। চটের বস্তা ব্যবহারে বিভিন্ন পণ্যের দাম কেজি প্রতি দেড় থেকে দুই টাকা করে বেড়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে বলা হয়, ভোক্তাদেরকেই এই টাকার যোগান দিতে হচ্ছে। আমদানিকারকেরা বলেছেন, আটা, ময়দা এবং চিনি মোড়কজাতকরণে চটের বস্তার ভিতরে রেক্সিনের বস্তা দিতে হচ্ছে। এতেও খরচ বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের ডালও সরাসরি চটের বস্তায় মোড়কজাত করা সম্ভব হয়না। এতে আর্দ্রতা ডাল নষ্ট করে দেয়।

বিজিএমসি সূত্র জানিয়েছে, পাটকলগুলোতে দুই ধরনের চটের বস্তা তৈরি হচ্ছে। যে বস্তা রপ্তানি হয়, তার দাম ৬০ থেকে ৭৫ টাকা। আর দেশীয় চাহিদা মেটাতে তৈরি হওয়া বস্তার দাম ৪২ থেকে ৫০ টাকা।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে নব্বই শতাংশ পণ্যই আসে পিপি ওভেন ব্যাগে। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বস্তাভর্তি পণ্যগুলোকে নতুন করে চটের বস্তায় মোড়কজাত করা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। বস্তাভর্তি যে পণ্য দেশে চলে এসেছে সেগুলোকে চটের বস্তায় ভরে বাজারজাত করা অনেকটা অসম্ভব। কিন্তু সেই অসম্ভব কাজটি করার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে আমদানিকারক বলেন, সোমবার থেকে এসব পণ্য পরিবহন অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার খবর পেয়ে ট্রান্সপোর্ট মালিকেরা চটের বস্তা ছাড়া অন্য বস্তার পণ্য পরিবহন করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এতে করে চট্টগ্রাম এবং নারায়নগঞ্জের বিভিন্ন গুদাম থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় বহু পণ্যের পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে।

 

একাধিক ট্রান্সপোর্ট মালিক জানান, তারা চটের বস্তা ছাড়া অন্য বস্তায় পণ্য পরিবহন করছেন না। তারা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে এক ট্রাক পণ্য ঢাকা নিয়ে চৌদ্দ পনের হাজার টাকা পাবো। অথচ ম্যাজিস্ট্রেট ধরলে জরিমানা করবেন পঞ্চাশ হাজার টাকা। টাকাও যাবে, জেলও খাটতে হবে। কী দরকার ভাই উটকো ঝামেলায় যাওয়া?

 

এদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংরক্ষণে পাটের মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশব্যাপি বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, পেয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুড়া সহ মোট ১৭টি পণ্যের সংরক্ষণ এবং এসব পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা মানা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে সোমবার থেকে এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ১৭টি পণ্যে শতভাগ পাটের বস্তার ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান চলবে।

 

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোমবার সারাদেশে জেলা নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ৭টি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়। এই অভিযানের সময় পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার না করায় মোট ৭০ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সোমবার রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালতের নেতৃত্ব দেন ঢাকা মেট্রো পলিটন এলাকার নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মশিউর রহমান। পাট অধিদপ্তরের পরিচালক লোকমান আহমদ (যুগ্ম সচিব) এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার সম্পর্কিত আইন বাস্তবায়নে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন।

 

আইনটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর ১০০ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা সৃষ্টি হবে বলে পাট মন্ত্রণালয় আশাবাদী। এছাড়াও এ ব্যবস্থায় স্থানীয় বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, পাট চাষীরা পাটের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিশ্চিত হবে। সর্বোপরি পাটের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ পাটর শিল্প এবং পরিবেশ উভয়ই রক্ষা পাবে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৬/৫/২০১৭/০-২০-১৬/আ/হৃ/