আটকে যাচ্ছেন নাগরী

মনির জামান, সাব এডিটর, বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

ক্রমশ সমস্যার জালে আটকে যাচ্ছেন ছড়াকার-কবি-শিল্পী শাহাবুদ্দীন নাগরী। বন্ধু বাসা থেকে বেরোলেই সেখানে যেতেন নাগরী। জানা যায়, একান্তে সময় কাটাতেন পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে। সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন তারা শারীরিকভাবে মিলিতও হতেন। বিষয়টি একসময় জেনে যান নাগরীর বন্ধু। তাই পথের কাঁটা দূর করতেই বন্ধু নূরুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।

নুরুল ইসলাম খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার নাগরী এখন রিমান্ডে রয়েছেন। রিমান্ডে তিনি অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

রিমান্ডে নাগরী বলেছেন, ‘নূরুল ইসলাম শারীরিকসম্পর্ক স্থাপনে অক্ষম ও অসুস্থ ছিলেন। তাই তার স্ত্রী নুরানী আক্তার সুমীর সঙ্গে নাগরীর পরকীয়া প্রেম গড়ে ওঠে। নুরুল বাসা থেকে বের হলেই সুমী প্রায় দিনই নাগরীকে ফোনে ঢেকে আনতেন। কয়েক ঘন্টা একান্তে কাটাতেন তারা।

নূরুলের স্ত্রীর সঙ্গে নাগরীর পরকীয়া সম্পর্ক আগে থেকেই চাউর ছিলো। কেবল নূরুলই নন, আত্মীয়-স্বজনও জানতো বিষয়টি। স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না নূরুল।। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকতো। সুমীকে বিনে বাধায় নিয়মিত ভোগ করতেই নূরুলকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন নাগরী। আর হঠাৎ এ খুনের ঘটনায় গ্রেফতার হন নাগরী, নিহত নুরুলের স্ত্রী নুরানী আক্তার সুমী (৩৫) ও সুমির গাড়ি চালক সেলিম।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্প্রতি নুরুল ইসলামের স্ত্রীকে নাগরী ১৪ লাখ টাকায় গাড়ি কিনে দিয়েছেন, সে তথ্যও আমরা পেয়েছি। এছাড়াও কিনে দিয়েছেন দামি ফ্ল্যাট। সেই গাড়ির চালক সেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। ওই হত্যাকাণ্ডে নাগরী ও সুমীর যোগসাজশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তে হত্যার মোটিভ জানা যাবে।

নিউ মার্কেট থানা পুলিশ জানায়, গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ১৭০/১৭১ নং ডম-ইনো অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচতলায় নিজ শয়নকক্ষ থেকে নুরুল ইসলামকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। পরে এ ঘটনায় তার বোন শাহানা রহমান কাজল বাদী হয়ে স্ত্রী নূরানী ও শাহাবুদ্দীন নাগরীসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে নিউ মার্কেট থানায় মামলা করেন। এরপরই নূরানী, বন্ধু নাগরী ও গাড়ি চালককে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সোমবার ওই মামলার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম ওয়ায়েজ কুরুনী খান চৌধুরী গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পাঁচদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বাসার ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটের দিকে বাসায় গিয়েছিলেন শাহাবুদ্দীন নাগরী। প্রবেশের ৪ ঘণ্টা ৪ মিনিট পর (সন্ধ্যা ৭টা ১৭ মিনিটে) বেরিয়ে আসেন তিনি। একই ঘটনায় শাহাবুদ্দীনের মোবাইল ফোন নম্বরও চেক করে দেখা হচ্ছে। নিহত নুরুলের স্ত্রীর সঙ্গে নাগরীর পরকীয়া সম্পর্ক তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমেও স্পষ্ট হয়েছে।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, নিহতের স্ত্রী নুরানী ও বন্ধু নাগরীর রিমান্ড শেষে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

নিহত নুরুল ইসলামের অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থাপক বাবু কুমার জানান, ‘৩৫ হাজার টাকা মাসিক ওই ভাড়া বাসায় বছরখানেক ধরে বাস করে আসছিলেন নূরুল ইসলাম। মাঝে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন তিনি। এরপর থেকে বেশিরভাগ সময় তিনি বিশ্রামে থাকতেন। কোনো কারণে নুরুল ইসলাম বাইরে গেলে নাগরী এসে হাজির হতেন। নুরুল ইসলাম থাকতেও বাসায় আসতেন তিনি। নুরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন সর্বশেষ ওই বাসায় নাগরীই এসেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

জানা যায়, শুধু বাসার ভাড়াই নয়, সুমীর গাড়ি চালক সেলিমের বেতনও দিতেন নাগরী। সেলিম দীর্ঘদিন ধরে নাগরীর গাড়ি চালাতেন। কিন্তু গাড়ি কিনে দেওয়ার পর নিজের চালক সেলিমকে সার্বক্ষণিক প্রেমিকার সেবায় নিয়োজিত করেন। কারণ, সেলিম হচ্ছে-নাগরীর খুব বিশ্বস্ত। তার কাছ থেকেই সুমীর প্রতিমুহূর্তের খবর জেনে নিতো নাগরী। সুমী কোথায়, কখন যেতেন-সে খবর পেতেন তিনি।

কবি নাগরীর বিরুদ্ধে অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নামি প্রকাশক বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই নাগরীর ব্যাপারে আমরা বিভ্রান্ত হই। তিনি মেধাবী তরুণ লেখকদের লেখা বই আকারে প্রকাশ করার কথা বলে তা হাতিয়ে নেন। পরে সেগুলো নিজের নামে প্রকাশ করেন। পরে সেটি নিয়ে আপত্তি করলে করলে তিনি টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করেন।’ কেউ কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন বলে জানান তিনি।

বিনোদন পাড়ায় নাগরীর বিরুদ্ধে রয়েছে আরও জঘন্য অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনি গোপনে নাটক-টেলিফিল্মে বিনিয়োগ করেন। উঠতি মডেল, অভিনেত্রীদের নিয়ে তিনি নাটক বানান, মোটা অঙ্কের টাকাও দেন। ওইসব তরুণীদেরই তিনি কাজে সুযোগ দেন, যারা তার সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে রাজি হয়।

নাগরীর বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের পাহাড়। দুর্নীতি করেই তিনি কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন। বিপুল সম্পদ গড়েছেন। কেবল সুমীই প্রথম নন, এর আগেও বহু সুন্দরী নারীকে তিনি শয্যাসঙ্গী করেছেন। ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। তাদের কাছে নিয়মিত যাতায়াতও ছিলো তার। নাগরীর পরিবার ও পরিচিতজন তার অবাধ যৌনাচারের কথা জানতেন। কিন্তু, কেউ কিছু বলার সাহস করতো না। তার দাপটে রীতিমতো অস্থির ছিলো অনেকেই।

একজন নাট্যপ্রযোজক জানান, নিত্যনতুন নারীর সঙ্গ পেতেই নাটকে বিনিয়োগ করতেন নাগরী। অবৈধ পথে অর্জিত বিপুল টাকা খরচের জন্য নারীর নেশায় মাতেন নাগরী। অবৈধ টাকা বৈধ করতেই তিনি হঠাৎ গায়ক বনে যান। প্রচুর টাকা খরচ করে গান ও বইয়ের প্রচার চালান তিনি। মূলত, জনপ্রিয়তা নয়, ব্যাপক প্রচারের কারণেই নাগরীকে মানুষ চেনে ও জানে।

রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, অসৎ উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি কালো টাকা সাদা বানাতেই তিনি সঙ্গিতে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, নাগরী ১২টি গানের অ্যালবাম করেছেন। আর এসব অ্যালবামের বেশির গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক নাগরী নিজেই। তিনি সবার কাছে প্রচার করতেন তার গানের অ্যালবাম বিক্রি হচ্ছে দেদার। গানের ক্যাসট বিক্রি করেই তিনি অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়েছেন। বাস্তবে নাগরীর কোনো ক্যাসেটই বিক্রি হতো না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

চাকরি জীবনে নাগরী ছিলেন খুব বেপরোয়া। কাউকেই তিনি তোয়াক্কা করতেন না। তিনি মনেপ্রাণে বিএনপির রাজনীতি ও আদর্শ ধারণ করেন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে হাওয়া ভবনে ছিলো তার অবাধ যাতায়াত। এমন কি আওয়ামী সরকারের আমলেও সরকারি চাকরিতে কর্মরত থেকেও তিনি বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। নিজের চাকরির প্রভাব খাটিয়ে বড় ব্যবসায়ীদের জিম্মি করতেন। তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনে অর্থায়ন করতেন। কারণ, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করছিলেন। সরকারি চাকরিতে থেকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা এবং সীমাহীন দুর্নীতির কারণে মহাজোট সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়।

নাগরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও রয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখা থেকে সর্বোচ্চ দরদাতাকে গাড়ি সরবরাহ না করে অন্যজনকে সরবরাহ করার অভিযোগের মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিলো। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বহু মামলা রয়েছে।

শাহাবুদ্দীন নাগরী নিজেকে একাধারে কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সুরকার, গায়ক ও নাট্যকার দাবি করেন। যদিও তার কবি-লেখক বন্ধুরা তার রচনাকে অতি নিম্নমানের ও রুচিহীন বলে অভিহিত করেছেন।